বাঙ্গালী
Tuesday 18th of June 2019
  1782
  0
  0

হযরত যায়নাব (সা. আ.) এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

ভাষান্তর : আলী পরাগ

জন্ম :

হযরত যায়নাবে কোবরা (সা. আ.) ৫ম (অন্য এক বর্ণনায় ৬ষ্ঠ) হিজরী'র ৫ই জমাদিউল আওয়াল মদিনা মুনাওয়ারায় জন্মগ্রহণ করেন।

 

পিতা-মাতা

তাঁর পবিত্র নাম ‘যায়নাব' এবং তার কুনিয়াত হচ্ছে; উম্মুল হাসান, উম্মু কুলসুম। আর তাঁর উপাধীগুলো হচ্ছে; সিদ্দিকাহ আল-সোগরা, ইসমাতুল সোগরা, ওয়ালিয়াতুল্লাহিল উজমা, নামুসুল কোবরা, শারিকাতুল হুসাইন (আলাইহিমাস সালাম), আলেমাহ গায়রু মুয়াল্লিমাহ, ফাদ্বিলাহ, কামিলাহ ইত্যাদি।

তাঁর সম্মানিত পিতা, শিয়াদের প্রথম ইমাম হযরত আমিরুল মু'মিনীন আলী ইবনে আবি তালিব (আ.)। আর তাঁর সম্মানিত মাতা দো-জাহানের নারীদের সর্দার সিদ্দিকায়ে কোবরা হযরত ফাতেমা (সা. আ.)।

 

নামকরণ

হযরত যায়নাব (সা. আ.) এর জন্মের সময় মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (স.) বিশেষ কাজে মদিনার বাইরে অবস্থান করছিলেন। যখন হযরত যায়নাব (সা. আ.) ভূমিষ্ঠ হলেন তখন ফাতেমা (সা. আ.) আমিরুল মু'মিনীন (আ.) কে বললেন যে, যেহেতু আমার বাবা মদিনার বাইরে গেছেন তাই আপনি এ শিশুর নাম রাখুন। তখন আমিরুল মু'মিনীন (আ.) বললেন : আমি কখনই কোন কাজে তোমার পিতার চেয়ে অগ্রসর হই না। ধৈর্য্য ধরো, কেননা আল্লাহর নবী (স.) অতি শীঘ্রই ফিরে আসবেন এবং যে নামটাকে তিনি যোগ্য মনে করেন, সে নাম তার জন্য নির্ধারণ করবেন।

তিনদিন পর মহানবী (স.) মদিনায় ফিরে আসলেন এবং স্বভাবতই তিনি প্রথমে হযরত ফাতেমা যাহরা (সা. আ.) এর বাড়ীতে গেলেন।

আমিরুল মু'মিনীন (আ.) তাঁকে বললেন : হে আল্লাহর রাসূল (সা.)! মহান আল্লাহ আমাকে একটি কন্যা দান করেছেন, আপনি তার জন্য একটি নাম রাখুন।

তিনি (স.) বললেন : যদিও ফাতেমার সন্তান আমারই সন্তান, তা সত্ত্বেও তাদের বিষয় মহান আল্লাহর হাতে এবং আমি ওহীর অপেক্ষায় থাকবো। এমন সময় জীবরাইল (আ.) অবতীর্ণ হয়ে বললেন : হে আল্লাহর রাসূল! মহান প্রভু আপনাকে সালাম জানিয়েছে বলেছেন : এ নবজাত শিশুর নাম রাখো ‘যায়নাব', কেননা এ নামকে লৌহে মাহফুজে লিপিবদ্ধ করেছি।

মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (স.) নবজাত শিশুকে আনতে বললেন, অতঃপর তিনি শিশুকে বুকে জড়িয়ে ধরে তার নাম রাখলেন যায়নাব। এরপর তিনি বললেন : আমি আমার উম্মতের উপস্থিত ও অনুপস্থিতদের উদ্দেশ্যে ওসিয়ত করছি যে, এ শিশুর সম্মান বজায় রেখো, কেননা তিনি খাদিজাতুল কোবরা (সালামুল্লাহ আলাইহা) এর সাদৃশ্য।

 

হযরত যায়নাব (সা. আ.) এর বুদ্ধিমত্তার একটি দৃষ্টান্ত

‘আসাভির মিনায যাহাব' গ্রন্থের প্রণেতা এ মহিয়সী নারীর বুদ্ধিমত্তার বিষয়ে এভাবে লিখেছেন যে,

তাঁর মেধা ও প্রখর বোধ শক্তির প্রমাণ উল্লেখ করার ক্ষেত্রে তার হতে বর্ণিত একটি রেওয়াতের কথা উল্লেখ করাই যথেষ্ট। তিনি হযরত ফাতেমা যাহরা (সালামুল্লাহ আলাইহা) কর্তৃক হযরত আমিরুল মু'মিনীন (আ.) এর অধিকার রক্ষা ও ফেদাক জবর দখল প্রসঙ্গে মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি) এর সাহাবীগণের উপস্থিতিতে যে দীর্ঘ খোতবা প্রদান করেছিলেন, সেই খোতবা বর্ণনা করেছেন।

ইবনে আব্বাসের মত মহান সাহাবী ও প্রথম সারীর রাবীও (রেওয়ায়েত বর্ণনাকারী) তাঁর হতে রেওয়ায়েত করেছেন এবং তাঁকে ‘আকিলা' নামে আখ্যায়িত করেছেন।

আবুল ফারাজে ইসফাহানী এ প্রসঙ্গে লিখেছেন : ইবনে আব্বাস হযরত ফাতেমা যাহরা (সা. আ.) এর খোতবাকে হযরত যায়নাব (সা. আ.) এর মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন। তিনি (ইবনে আব্বাস) বলেন :

((حدثتنی عقیلتنا زینب بنت علی علیها السلام))

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ঐ সময় হযরত যায়নাব অল্প বয়স্ক (৭ বছর অথবা তারচেয়ে কম) হওয়া সত্ত্বেও, কঠিন শিক্ষা সমৃদ্ধ ও আশ্চার্যজনক এ খোতবা শুধুমাত্র একবার শুনে মুখস্থ করে নিজেই হযরত ফাতেমা যাহরা (সা. আ.) এর বাগ্মী এ খোতবার বর্ণনাকারী হয়েছেন।

 

বাকপটুতা ও বাগ্মীতা

হযরত যায়নাব (সা. আ.) এর বাগ্মীতা ও বাকপটুতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হচ্ছে তাঁর প্রদত্ত খোতবাসমূহ। যে মহিয়সী সম্পর্ক হযরত ইমাম সাজ্জাদ (আ.) বলেন :

((أنت بحمدِ الله عالمة غیر معلمة و فهمة غیر مفَهِّمَة))

অনুবাদ : ‘হে ফুপু! আল-হামদু লিল্লাহ আপনি এমন একজন জ্ঞানী নারী যে কোন শিক্ষা গ্রহণ করেনি এবং এমন একজন বুঝশক্তি সম্পন্ন নারী যে, যাকে কোন মানুষই বোঝানোর ক্ষেত্রে শিক্ষা দেয়নি'।

এ পর্যায় ইয়াযিদের দরবারের তাঁর কর্তৃক প্রদত্ত খোতবার অংশবিশেষ উল্লেখ করা হল, কারবালার ঘটনার পর যে পদক্ষেপের মাধ্যমে তিনি বনি উমাইয়ার রাজতন্ত্রের ভিত্তি নড়বড়ে করে দিয়েছিলেন।

তিনি তার খোতবায় বলেন :

‘আল্লাহর কসম হে ইয়াযিদ, যা কিছু তুমি করেছো, তার সবটাই তোমার প্রতিই ফিরে আসবে। কেননা তুমি নিজের চামড়া ব্যতীত অন্য কারো চামড়ো বিচ্ছিন্ন করোনি এবং নিজের মাংস ব্যতীত অন্য কারো মাংস ছিঁড়ো নি।

হে ইয়াযিদ! যেদিন মহান আল্লাহ অধিকার আদায়ের জন্য আমাদের পবিত্র শহীদদের লাশ উপস্থিত করবেন, সেদিন তোমাকে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লামে'র সম্মুখে আনা হবে। কিন্তু তুমি কি জানো তখন তোমার অবস্থা কিরূপ থাকবে? যখন তুমি তার প্রিয়জনদের রক্ত ঝরিয়েছো এবং তার বংশধরের সম্মানকে নষ্ট করেছো। হ্যাঁ ইয়াযিদ! বাহ্যিক যে বিজয় তুমি লাভ করেছো তাতে তুমি আনন্দে আত্মহারা হয়ো না এবং কারবালায় যাদের তুমি রক্ত ঝরিয়েছো তাদেরকে পরাজিত এবং মৃত মনে করো না, কেননা মহান আল্লাহ বলেন : "যারা আল্লাহর রাস্তায় শহীদ নিহত হয় তাদেরকে মৃত ভেবো না, বরং তারা জীবিত এবং নিজেদের প্রভুর নিকট রুজি পায়"। [সূরা আলে ইমরান : ১৬৯]

হে ইয়াযিদ! তোমার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, ঐ দিনের বিচরক হবেন মহান আল্লাহ্, তোমার শত্রু হবেন আল্লাহর রাসূল এবং আহলে বাইত (আ.) এর পৃষ্ঠপোষক হবেন জীবরাইল। যে ব্যক্তি (মুয়াবিয়া) এই পদকে তোমার জন্য সৌন্দর্য্য দান করেছে এবং তোমাকে মুসলমানদের উপর বসিয়েছে, সে বুঝতে পারবে যে, সে নিজের জন্য কতই না মন্দ স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করেছে এবং পুরস্কারের দিন বুঝতে পারবে যে, সবচেয়ে নিকৃষ্ট স্থান কার জন্য নির্ধারিত?...

 

সমস্যার সমাধান

হযরত যায়নাব সালামুল্লাহি আলাইহা এমন এক মহিয়সী'র নাম, যার প্রতি তাওয়াসসুল করে অনেক কঠিন সমস্যার সমাধান লাভ করেছেন অনেকে এবং ঐ মহিয়সী'র অসংখ্য কেরামতও বর্ণিত হয়েছে। লেখনির পরিসরের প্রতি দৃষ্টি রেখে শুধুমাত্র একটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করলাম। সুন্নি মাযহাবের প্রখ্যাত ওলামা শাবলাঞ্জী নূরুল আবসার গ্রন্থে লিখেছেন :

‘শেইখ আব্দুর রহমান আজহুরী মুকিররী স্বীয় গ্রন্থ মাশারেকুল আনওয়ার-এ উল্লেখ করেছেন : ১৩৭০ হিজরীতে কঠিন এক সমস্যার সম্মুখীন হয়ে হযরত যায়নাব (সা. আ.) এর মাজারে গিয়ে তার প্রতি তাওয়াসসুল করে তার শানে একটি কাসিদা পড়লাম : যার একটি লাইন ছিল ;

آل طاها لکم علینا الولاء لا سواکم بما لکم آلآء

মহান আল্লাহ ঐ মহিয়সী'র বরকতে আমার সকল সমস্যার সমাধান করে দেন।

 

হযরত যায়নাব (সা. আ.) এর শাহাদাত

কারবালার বার্তাবাহী হযরত যায়নাব (সা. আ.) অবশেষে ১৫ই রজব ৬৩ হিজরীতে তাঁর স্বামী হযরত আব্দুল্লাহর সাথে শাম (সিরিয়া) সফরে যান এবং সেখানে শাহাদাত বরণ করেন। আর সেস্থানেই তাকে দাফন করা হয়।

আত্মত্যাগী ও মহিয়সী এ নারীর মাজার বর্তমানে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে অবস্থিত, যা বর্তমানে আহলে বাইত (আ.) এর অনুসারীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ যেয়ারতের স্থান হিসেবে বিবেচিত।

(সূত্র : asemanmibarad.blogfa.com)

 


source : www.sibtayn.com
  1782
  0
  0
امتیاز شما به این مطلب ؟

latest article

      ওয়াহাবিরা ইসলামী নির্দশনগুলো ধ্বংস ...
      মহানবী (স.), আহলে বাইত (আ.) ও সাহাবীদের ...
      হযরত ফাতেমার প্রতি নবী (সা.)-এর মহব্বত ...
      সাইয়্যেদুন্নিসা খাতুনে জান্নাত ...
      মহানবী’র (সা.) জন্মস্থান ধ্বংস করে ...
      তাকওয়া অর্জনের উত্তম মৌসুম
      ধর্ম বিশ্বাস প্রশান্তির প্রধান উৎস
      ইসলামের দৃষ্টিতে কর্ম ও শ্রম (১ম পর্ব)
      নবীবংশের এগারতম নক্ষত্র ইমাম হাসান ...
      নবীবংশের এগারতম নক্ষত্র ইমাম আসকারী ...

 
user comment