বাঙ্গালী
Tuesday 29th of September 2020
  41
  0
  0

কোরআনের দৃষ্টিতে : আহলে নাজাত্ কা’রা?

কোরআনের দৃষ্টিতে : আহলে নাজাত্ কা’রা?

চৈন্তিক-আদর্শিক ও আচরণগত এবং তার গুণগত ও মানগত অবস্থা বিবেচনায় কোরআন মজীদ মানুষকে বিভিন্ন পরিচয়ে উল্লেখ করেছে। কোরআন মজীদের বিভিন্ন আয়াতে এ বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।

আমরা সাধারণতঃ মনে করি যে, কোরআন মজীদে মানুষদেরকে মুসলমান, কাফের ও মুনাফিক্ব এই তিন পরিচয়ে পরিচিত করা হয়েছে। এ হচ্ছে এক বিশেষ বিবেচনার পরিচিতি; কোরআন মজীদে অন্যান্য বিবেচনায় মানুষদেরকে আরো বিভিন্ন ভাগে ও উপবিভাগে বিভক্ত হিসেবে পরিচিত করা হয়েছে।

বর্তমানে আমরা “ইসলাম” ও “মুসলমান” বলতে যে পারিভাষিক অর্থ বুঝে থাকি তা হচ্ছে শব্দ দু’টির শ্রুতিভিত্তিক প্রথম তাৎপর্য অর্থাৎ বহুল প্রচলনের কারণে শব্দ দু’টি শোনার সাথে সাথে অন্য কোনো নিদর্শন বা ব্যাখ্যা ছাড়াই আমাদের মস্তিষ্কে যে অর্থ ফুটে ওঠে। তবে এ অর্থ শব্দ দু’টির না ব্যুৎপত্তিগত অর্থ, না একমাত্র অর্থ, বরং আভিধানিক ও পারিভাষিক দিক থেকে শব্দ দু’টির আরো অর্থ আছে এবং কোরআন মজীদে বিভিন্ন প্রসঙ্গে তা বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে সংক্ষেপে বলা যেতে পারে যে, “ইসলাম” শব্দের অর্থ সাধারণতঃ ‘শান্তি’ করা হয় এবং বলা হয় যে, ‘ইসলাম শান্তির ধর্ম’। কিন্তু যদিও ইসলামের ফল হচ্ছে ‘শান্তি’, কিন্তু “ইসলাম” মানে ‘শান্তি’ নয়, বরং “ইসলাম” মানে ‘আত্মসমর্পণ’ অর্থাৎ জীবন ও জগতের পিছনে নিহিত ইন্দ্রিয়াতীত মহাজ্ঞানময় উৎস আল্লাহ্ তা‘আলার কাছে আত্মসমর্পণ। আর যেহেতু অশান্তির কারণ সমস্ত রকমের অভাব, স্বার্থপরতা ও দুর্বলতা থেকে তিনি প্রমুক্ত সেহেতু একমাত্র তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ ও তাঁর বিধিবিধান মেনে চলার মাধ্যমেই অশান্তির অবসান ঘটা ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব।

এখানে আরো উল্লেখ্য যে, ইসলাম অন্যান্য ধর্মের ন্যায় কোনো ধর্ম নয় অর্থাৎ অন্যান্য ধর্ম যে অর্থে ‘ধর্ম’ সে অর্থে ইসলাম আদৌ কোনো ধর্ম নয় এবং এ কারণে ‘ইসলাম’-এর নামকরণের ভিত্তিও অন্যান্য ধর্মের নামকরণের ভিত্তি থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। অন্যান্য ধর্মের নামকরণ হয়েছে বিভিন্ন ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা ভূখণ্ডের নামে, যেমন : ইয়াহূদার নামে ইয়াহূদী ধর্ম, যীশূ খৃস্ট [হযরত ‘ঈসা (‘আঃ)]-এর নামে খৃস্ট ধর্ম, বুদ্ধের নামে বৌদ্ধ ধর্ম, ‘হিন্দ্’ [ভারত]-এর অধিবাসীদের ধর্ম হিন্দু ধর্ম ইত্যাদি। কিন্তু ‘ইসলাম’-এর নামকরণ হয়েছে এর তাৎপর্যের ভিত্তিতে অর্থাৎ জীবন ও জগতের স্রষ্টা অপরিহার্য সত্তার কাছে আত্মসমর্পণই হচ্ছে ‘ইসলাম’ এবং যারাই তা করেছে তারাই ‘মুসলিম’, সে জন্য সংশ্লিষ্ট লোকেরা স্বীয় জীবনাদর্শ ও নিজেদের জন্য ‘ইসলাম’ ও ‘মুসলিম’ পরিভাষা ব্যবহার করুক বা না-ই করুক। অন্যদিকে কেউ যদি স্বীয় চলার পথ ও নিজেদের জন্য এ দু’টি পরিভাষা ব্যবহার করেও কিন্তু চিন্তা ও কর্মে সৃষ্টিকর্তার কাছে আত্মসমর্পণ না করে তাহলে প্রকৃত পক্ষে তাদের চলার পথ ‘ইসলাম’ নয় এবং তারা ‘মুসলিম’ নয়।

বর্তমানে ‘ইসলাম’ ও ‘মুসলিম’ শব্দ দু’টি উচ্চারণের সাথে সাথে আমাদের মস্তিষ্কে যে তাৎপর্য প্রতিফলিত হয় কোরআন মজীদে শব্দ দু’টির ব্যবহার এ তাৎপর্যের মধ্যে সীমিত নয়। কোরআন মজীদে হযরত ইবরাহীম (‘আঃ), ইসমা‘ঈল্ (‘আঃ), ইসহাক্ব্ (‘আঃ) ও তাঁদের বংশধরদের জন্য ‘মুসলিম’ শব্দ ব্যহার করা হয়েছে (সূরাহ্ আল্-বাক্বারাহ্ : ১২৮ ও ১৩৩)। তাছাড়া হযরত ইবরাহীম্ (‘আঃ) তাঁর অনুসারী সহ তৎকালীন ও পরবর্তীকালীন নির্বিশেষে তাওহীদবাদীদের জন্য ‘স্রষ্টার কাছে আত্মসমর্পিত জনগোষ্ঠী’ (মুসলিমূন্) নামকরণ করেন (সূরাহ্ আল্-হাজ্ব্ : ৭৮), যদিও পরবর্তীকালে এ ধারার লোকদের মধ্য থেকে অনেকে ‘স্রষ্টার কাছে আত্মসমর্পণ’-এর মূল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে নিজেদের জন্য ‘ইয়াহূদী’ ও ‘খৃস্টান’ নাম গ্রহণ করেছে।

ওপরের আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট যে, কোরআন মজীদের দৃষ্টিতে আহলে নাজাত বা মুক্তিপ্রাপ্তির অধিকারী জনগোষ্ঠী কেবল বর্তমানে প্রচলিত ‘মুসলিম’ পরিভাষার আওতাভুক্ত লোকেরা নয়, বরং কোরআন মজীদে শব্দটির যে ব্যাপক অর্থ ভিত্তিক ব্যবহার হয়েছে তার আওতাভুক্ত লোকেরা অর্থাৎ প্রথম মানুষ হযরত আদম (‘আঃ) থেকে শুরু করে যারাই প্রকৃত অর্থে একমাত্র আল্লাহ্ তা‘আলার কাছে (তা তাদের কাছে তাঁর নাম ‘আল্লাহ্’ না হয়ে অন্য কিছু হলেও) আত্মসমর্পণ করেছে ও করবে তারাই প্রকৃত মুসলিম (তা তারা নিজেদের জন্য ‘মুসলিম’ শব্দ ব্যবহার করুক বা না-ই করুক) এবং তারাই আহলে নাজাত। এ বিষয়টি কোরআন মজীদের একাধিক আয়াতে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে।

আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন :

إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ هَادُوا وَالنَّصَارَى وَالصَّابِئِينَ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَهُمْ أَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَلا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلا هُمْ يَحْزَنُونَ.

 “নিঃসন্দেহে যারা ঈমান এনেছে (এই নবীর প্রতি) এবং যারা ইয়াহূদী, খৃস্টান্ ও ছ্বাবেয়ী তাদের মধ্য থেকে যে-ই আল্লাহ্ ও পরকালের প্রতি ঈমান পোষণ করে এবং যথাযথ কর্ম সম্পাদন করে তাদের জন্য তাদের রবের কাছে পুরষ্কার রয়েছে; তাদের কোনো ভয়ের কারণ নেই এবং তারা দুঃখিত হবে না।” (সূরাহ্ আল্-বাক্বারাহ্ : ৬২)

এ আয়াত থেকে সুস্পষ্ট যে, নাজাত পাওয়ার জন্য শর্ত হচ্ছে তাওহীদ ও আখেরাতে ঈমান এবং যথাযথ আমল। এখানে লক্ষণীয় যে, ইয়াহূদী, খৃস্টান্ ও ছ্বাবেয়ীদের নাজাত লাভের জন্য রাসূলে আকরাম হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর ওপর ঈমান আনার শর্ত আরোপ করা হয় নি। অবশ্য অনেকে বলেন যে, এ আয়াতে তাঁর নবুওয়াত লাভের পূর্ববর্তী ইয়াহূদী, খৃস্টান্ ও ছ্বাবেয়ীদের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তাঁদের এ ধারণা ঠিক নয়। কারণ, এ আয়াত হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর ওপর নাযিল হয়েছে।

এখানে প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, উপরোক্ত আয়াতে ইয়াহূদী, খৃস্টান্ ও ছ্বাবেয়ীদের কথা বলা হলেও এর বক্তব্যের প্রযোজ্যতা কেবল এ তিন ধর্মের অনুসারীদের জন্য প্রযোজ্য নয়, বরং যারাই তাওহীদ ও আখেরাতে ঈমান পোষণ করে এবং যথাযথ আমল সম্পাদন করে তারাই আহলে নাজাত।

এ প্রসঙ্গে আরো স্মর্তব্য যে, প্রকৃত অর্থে ঈমান ও যথাযথ আমল না থাকলে ‘মুসলমান’ নামধারী মাত্রই যেমন আহলে নাজাত নয় তেমনি তাওহীদ ও আখেরাতে ঈমান এবং যথাযথ আমল না থাকলে কোনো ইয়াহূদী, খৃস্টান্ ও ছ্বাবেয়ী-ও নাজাত লাভ করবে না। বিশেষ করে তাদের মধ্যে অনেকেই তাওহীদবাদী নয়, যেমন : ত্রিত্ববাদী খৃস্টানরা। আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন :

وَلَوْ آمَنَ أَهْلُ الْكِتَابِ لَكَانَ خَيْرًا لَهُمْ مِنْهُمُ الْمُؤْمِنُونَ وَأَكْثَرُهُمُ الْفَاسِقُونَ.

 “আর আহলে কিতাব্ যদি (এ নবীর প্রতি) ঈমান আনতো তাহলে তা তাদের জন্য কল্যাণকর হতো। বস্তুতঃ তাদের মধ্যে ঈমানদারও রয়েছে, তবে তাদের অধিকাংশই ফাসেক্ব্ (পাপাচারী)।” (সূরাহ্ আালে ‘ইমরান্ : ১১০)

এ আয়াতে “তাদের মধ্যে ঈমানদারও রয়েছে” কথাটির দ্বারা সেই স্বল্পসংখ্যক তাওহীদবাদী ও যথাযথ আমলের অধিকারী আহলে কিতাবের কথা বলা হয়েছে যাদের কাছে হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর নবুওয়াতের বিষয়টি হুজ্জাত্ পূর্ণ হওয়ার পর্যায়ে সুস্পষ্ট হয় নি বিধায় তারা তাঁর প্রতি ঈমান আনে নি। অনেকে অবশ্য মনে করেন যে, এখানে “তাদের মধ্যে ঈমানদারও রয়েছে” বলতে আহলে কিতাবের মধ্যে যারা হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর প্রতি ঈমান এনেছিলেন তাঁদের কথা বুঝানো হয়েছে। কিন্তু এ ধারণা ঠিক নয়। কারণ, নবী করীম (ছ্বাঃ)-এর প্রতি ঈমান আনয়ন করার পর আর কাউকে আহলে কিতাবের মধ্যকার ঈমানদার বলে উল্লেখের মানে হয় না, ঠিক যেভাবে মুশরিকদের মধ্য থেকে ঈমান আনয়নকারীদের সম্পর্কে বলা ঠিক হবে না যে, “তাদের মধ্যে ঈমানদারও রয়েছে”।

এ প্রসঙ্গে আরো যোগ করা যেতে পারে যে, কোরআন মজীদে অন্যত্র যে ইয়াহূদী ও খৃস্টানদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করা হয়েছে তা শিরক ও পাপাচারে নিমজ্জিত ইয়াহূদী ও খৃস্টানদের সম্পর্কেই বলা হয়েছে তাদের মধ্যকার তাওহীদ ও আখেরাতে ঈমানদার ও যথাযথ আমল সম্পাদনকারীদের সম্পর্কে নয়।

প্রশ্ন হচ্ছে এ আয়াতে ইয়াহূদী, খৃস্টান্ ও ছ্বাবেয়ীদের নাজাত লাভের জন্য হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর ওপর ঈমান আনার শর্ত আরোপ করা হয় নি কেন? কারণ, তাওহীদ ও আখেরাতে ঈমান এবং মৌলিক ভালো-মন্দের জ্ঞান মানুষের মধ্যে সহজাতভাবে সম্ভাবনা আকারে নিহিত রাখা হয়েছে - যা তার বিচারবুদ্ধির বিকাশের সাথে সাথে তার মধ্যে বিকশিত হতে থাকে এবং সে সাবালেগ্ব্ হওয়ার সাথে সাথে তার মধ্যে তা ন্যূনতম প্রয়োজনীয় মাত্রায় বিকাশ লাভ করে।

আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন :

وَفِي الأرْضِ آيَاتٌ لِلْمُوقِنِينَ وَفِي أَنْفُسِكُمْ أَفَلا تُبْصِرُونَ.

“আর পৃথিবীর মধ্যে এবং তোমাদের নিজেদের মধ্যেও প্রত্যয়ীদের জন্য (আল্লাহ্ তা‘আলার) নিদর্শন রয়েছে; তবে তোমরা কি অন্তর্দৃষ্টি দ্বারা প্রত্যক্ষ করছো না?” (সূরাহ্ আয্-যারি‘আাত্ : ২০-২১)

এ থেকে সুস্পষ্ট যে, মানুষের বিচারবুদ্ধির ন্যূনতম প্রয়োজনীয় মাত্রায় বিকাশ হওয়ার পর জীবন ও জগত সম্পর্কে চিন্তা করে সে মোটামুটিভাবে তাওহীদে উপনীত হয় এবং সৃষ্টিকর্তার সাথে স্বীয় সম্পর্ক ও তাঁর কাছে স্বীয় দায়বদ্ধতা অনুভব করে এবং এ থেকে সে মৃত্যুর পরে সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক তাকে পুনঃসৃষ্টি ও জবাবদিহিতার ব্যাপারেও প্রত্যয়ে উপনীত হয়। আর সে বালেগ্ব্ হওয়ার পরে তার এতদ্সম্পর্কিত বিচারবুদ্ধিজাত জ্ঞান ন্যূনতম মাত্রায় পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়। (এ সম্পর্কে আমি আমার জীবন জিজ্ঞাসা গ্রন্থে বিচারবুদ্ধির আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করে বিষয়টি প্রমাণ করেছি।)

আর কর্মের ভালো-মন্দ সম্পর্কিত ন্যূনতম জ্ঞান সম্পর্কে আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন :

وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّاهَا فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا.

 “আর শপথ সেই ব্যক্তিসত্তার এবং যা তিনি ঠিকঠাক (ভারসাম্যপূর্ণ) করেছেন, আর এরপর তাতে তার পাপসমূহ ও তাক্ব্ওয়া (-এর জ্ঞান) ইলহাম্ করে দিয়েছেন।” (সূরাহ্ আশ্-শামস : ৭-৮)

কিন্তু ওয়াহী ও নবুওয়াতের জ্ঞান এ পর্যায়ের নয়। অর্থাৎ মানুষের বিচারবুদ্ধি সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে সহজাত ও বিচারবুদ্ধিজাত পথনির্দেশ ছাড়াও আরো পথনির্দেশ ও পথনির্দেশের বাহকের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেও কার্যতঃ পথনির্দেশ ও পথনির্দেশককে খুঁজে পাবার বা চিনতে পারার বিষয়টি এভাবে সহজাত নয় এবং এ ব্যাপারে বিচারবুদ্ধির অনুসন্ধান তার পথে বিরাজমান বিভিন্ন বাধার কারণে সফল না-ও হতে পারে তথা সে প্রকৃত পথনির্দেশ ও পথনির্দেশকের সন্ধান না-ও পেতে পারে এবং সন্ধান পেলেও বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে তার পক্ষে এ ব্যাপারে প্রত্যয়ে উপনীত হওয়া সম্ভব না-ও হতে পারে - পারিভাষিকভাবে যাকে হুজ্জাত্ পূর্ণ হওয়া ও না-হওয়া বলা হয়ে থাকে।

কারো জন্য যদি ওয়াহী ও নবুওয়াতের ব্যাপারে হুজ্জাত পূর্ণ না হয় তাহলে বিচারবুদ্ধির রায় অনুযায়ী এ ব্যাপারে তার কোনো দায়িত্ব থাকতে পারে না। আর আল্লাহ্ তা‘আলাও এ ব্যাপারে তাকে পাকড়াও করবেন না। কারণ, তিনি এরশাদ করেছেন :

لا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلا وُسْعَهَا

“আল্লাহ্ কোনো ব্যক্তির ওপর তার সাধ্যের অতীত দায়িত্ব দেন না।” (সূরাহ্ আল্-বাক্বারাহ্ : ২৮৬)

এ থেকে সুস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে, কেন আল্লাহ্ তা‘আলা নাজাত পাওয়ার জন্য হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর ওপর ঈমান আনাকে অপরিহার্য শর্ত করেন নি। অবশ্য কারো জন্য যদি তাঁর নবুওয়াত্ ও কোরআন মজীদের আল্লাহর কিতাব্ হওয়ার ব্যাপারে হুজ্জাত্ পূর্ণ হয় কিন্তু এ সত্ত্বেও সে ঈমান না আনে তাহলে সুস্পষ্ট যে, সে কোনো না কোনো ধরনের পার্থিব স্বার্থের কারণে নেফাক্বের আশ্রয় নিয়েছে, সুতরাং সে আহলে নাজাত নয়।

আমরা আলোচনার শুরুতে বলেছি যে, ইসলাম আদৌ কোনো ধর্ম নয়, ওপরের আলোচনা থেকে তা-ই প্রমাণ হয়। কারণ, অন্য যে কোনো ধর্মই একমাত্র ঐ ধর্মের অনুসারণকারীকে আহলে নাজাত বলে দাবী করে, অন্য কোনো ধর্মের অনুসারীকে আহলে নাজাত বলে স্বীকার করে না। কিন্তু একমাত্র ইসলাম এ সঙ্কীর্ণতার উর্ধে এবং কেউ ‘ইসলাম’ ও ‘মুসলমান’ পরিভাষার পরিচিতি ব্যবহার করুক বা না-ই করুক তাওহীদ ও আখেরাতে ঈমান এবং যথাযথ আমল সম্পাদনকারীকে, এমনকি যে কোনো নবীর ওপর ঈমানদার নয়, বরং কেবল সহজাত ও বিচারবুদ্ধির জ্ঞান অনুযায়ী করণীয় কাজগুলো সম্পাদন করে ও বর্জনীয় কাজগুলো বর্জন করে তাকেই আহলে নাজাত বলে স্বীকার করে।

এবার আমরা ভিন্ন এক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টির ওপর আলোকপাত করবো। তা হচ্ছে, কোরআন মজীদ নিজেকে পথনির্দেশ হিসেবে পরিচিত করিয়েছে, তবে এ-ও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, কোরআন থেকে সকলেই পথনির্দেশ পাবে না। শুধু তা-ই নয়, বিস্ময়কর ব্যাপার হলো এই যে, কোরআন মজীদ বলেছে যে, তা অনেক লোককে বিভ্রান্তও করে। এটা বিস্ময়কর এ কারণে যে, অন্য কোনো ধর্মগ্রন্থই নিজেকে বিভ্রান্তকারী বলে পরিচিত করে নি। প্রশ্ন হচ্ছে, কোরআন কা’দেরকে বিভ্রান্ত করে?

আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন :

إِنَّ اللَّهَ لا يَسْتَحْيِي أَنْ يَضْرِبَ مَثَلا مَا بَعُوضَةً فَمَا فَوْقَهَا فَأَمَّا الَّذِينَ آمَنُوا فَيَعْلَمُونَ أَنَّهُ الْحَقُّ مِنْ رَبِّهِمْ وَأَمَّا الَّذِينَ كَفَرُوا فَيَقُولُونَ مَاذَا أَرَادَ اللَّهُ بِهَذَا مَثَلا يُضِلُّ بِهِ كَثِيرًا وَيَهْدِي بِهِ كَثِيرًا وَمَا يُضِلُّ بِهِ إِلا الْفَاسِقِينَ.

 

“নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ মশার ও তার পরে তদুর্ধ কিছুর উপমা প্রদান করতে লজ্জাবোধ করেন না। অতঃপর, যারা ঈমান এনেছে তারা তো জানে যে, এ হচ্ছে তাদের রবের পক্ষ থেকে আগত সত্য, কিন্তু যারা কাফের হয়েছে (সত্যকে প্রত্যাখ্যান করেছে) তারা বলে : “এ উপমা দ্বারা আল্লাহ্ কী বুঝাতে চেয়েছেন!?” (প্রকৃত পক্ষে) তিনি এর দ্বারা অনেককে পথভ্রষ্ট করেন এবং এর দ্বারা অনেককে পথপ্রদর্শন করেন; আর তিনি এর দ্বারা কেবল ফাসেক্ব্ (পাপাচারী)দের ব্যতীত কাউকে পথভ্রষ্ট করেন না।” (সূরাহ্ আল্-বাক্বারাহ্ : ২৬)

বস্তুতঃ জন্ডিসের রোগী যেমন সাদাকে হলুদ রঙের দেখতে পায় ঠিক একইভাবে পাপাচারী ব্যক্তিরা আল্লাহ্ তা‘আলার নাযিলকৃত হেদায়াত কোরআন মজীদ থেকে কেবল বিভ্রান্তই হয়ে থাকে।

এবার প্রশ্ন হচ্ছে কা’রা কোরআন থেকে হেদায়াত বা পথনির্দেশ পায়? এ সম্বন্ধে আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেছেন :

ذَلِكَ الْكِتَابُ لا رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِلْمُتَّقِينَ الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ وَالَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ وَبِالآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ.

 “এ হচ্ছে সেই কিতাব্ যাতে সন্দেহজনক কিছুই নেই - যা মুত্তাক্বীদের জন্য হেদায়াত যারা ইন্দ্রিয়াতীত অস্তিত্বে ঈমান পোষণ করে এবং ছ্বালাত্ ক্বাএম্ রাখে, আর আমি তাদেরকে যে রিয্ক্ব্ প্রদান করেছি তা থেকে ব্যয় করে, আর যারা (হে রাসূল!) আপনার ওপর যা নাযিল হয়েছে এবং আপনার পূর্বে যা নাযিল হয়েছে তাতে ঈমান পোষণ করে। আর তারা আখেরাতের ওপরে প্রত্যয় (ইয়াক্বীন্) পোষণ করে।” (সূরাহ্ আল্-বাক্বারাহ্ : ২-৪)

এখানে লক্ষণীয় বিষয় যে, কোরআন মজীদ বহু আয়াতে “হে যারা ঈমান এনেছো!/ হে ঈমানদারগণ!” (يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا) বলে সম্বোধন করলেও কোরআন থেকে যারা হেদায়াত লাভে সক্ষম তাদের বিবরণ দিতে গিয়ে উপরোদ্ধৃত আয়াত সমূহে “মু’মিনগণ” বা “ঈমানদারগণ” শব্দ ব্যবহার করে নি, বরং “মুত্তাক্বী” শব্দ ব্যবহার করেছে। “মুত্তাক্বী” মানে ‘যে বেঁচে থাকে’, পারিভাষিক অর্থে যে, চূড়ান্ত ক্ষতি থেকে অর্থাৎ পরকালীন জীবনের ক্ষতি থেকে বেঁচে থাকে বা এ জন্য সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা করে। এ কারণে অনেকে শব্দটির অনুবাদ করেন ‘সতর্কতা অবলম্বনকারী’ - যা অবশ্য মূল তাৎপর্যের বেশ কাছাকাছি। ‘পরহেযগার’ শব্দেও মোটামুটি একই তাৎপর্য প্রতিফলিত হয়েছে, কারণ, এর মানে হচ্ছে, এমন ব্যক্তি যা তার ক্ষতির কারণ হতে পারে সে তা পরহেয অর্থাৎ পরিহার করে চলে।

বলা বাহুল্য যে, এখানে পারিভাষিক অর্থে ‘মু’মিন’ বা ‘মুসলিম’ বুঝানো উদ্দেশ্য হলে সে শব্দই ব্যবহৃত হতো, ‘মুত্তাক্বী’ শব্দ ব্যবহৃত হতো না। সুতরাং এখানে ‘মুত্তাক্বী’ বলতে ‘মু’মিন’ বা ‘মুসলিম’ বুঝানো উদ্দেশ্য নয় যদিও এতে প্রকৃত মু’মিন ও মুসলিম-ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বলা বাহুল্য যে, এখানে “মুত্তাক্বী” শব্দটি বর্তমানে প্রচলিত পারিভাষিক বা সাধারণ্যে প্রচলিত অর্থে অর্থাৎ প্রচলিত অর্থের ‘মুসলমানদের’ মধ্যকার উত্তম আমলের অধিকারী ও গুনাহ্ পরিহারকারী লোকদের বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয় নি। বরং এখানে ‘মুত্তাক্বী’ বলতে যাদেরকে বুঝানো হয়েছে স্বয়ং কোরআন মজীদ এ শব্দের পর পরই তাদের পরিচয় তুলে ধরেছে।

উদ্ধৃত আয়াত সমূহে ‘মুত্তাক্বী’ বলতে একাধিক গোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এদের মধ্যে প্রথম গোষ্ঠীটি হচ্ছে : যারা ইন্দ্রিয়াতীত অস্তিত্বে (الْغَيْب) ঈমান পোষণ করে এবং ছ্বালাত্ ক্বাএম্ রাখে ও স্বীয় রিয্ক্ব্ থেকে ব্যয় করে। দ্বিতীয় গোষ্ঠীটি হচ্ছে তারা যারা হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর ওপর ও তাঁর পূর্বে (আল্লাহর পক্ষ থেকে) যা কিছু নাযিল হয়েছে তার ওপরে ঈমান রাখে। আর এ উভয় গোষ্ঠীরই অভিন্ন বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই যে, তারা আখেরাতের ওপরে প্রত্যয় (ইয়াক্বীন্) পোষণ করে। অবশ্য কোরআন মজীদের অন্যান্য আয়াতের আলোকে বুঝা যায় যে, এদের মধ্যে উপবিভাগও রয়েছে। যেমন : দ্বিতীয় ভাগটিতে একটি উপবিভাগে হচ্ছে তারা যারা হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর ওপর যা নাযিল হয়েছে তাতে ঈমান পোষণ করে না, কিন্তু তাঁর পূর্বে যা কিছু নাযিল হয়েছে তার সব কিছুতে বা তার কোনো কোনোটিতে ঈমান পোষণ করে।

উদ্ধৃত আয়াত সমূহে প্রথমোক্ত বিভাগে এমন লোকেরা অন্তর্ভুক্ত যাদের কাছে ওয়াহী ও নবীর পরিচয় পৌঁছে নি বা পৌঁছলেও সঠিকভাবে না পৌঁছায় তাদের কাছে তা সত্য বলে মনে হয় নি, কিন্তু তারা সহজাত ও বিচারবুদ্ধিজাত জ্ঞানের কারণে ইন্দ্রিয়াতীত অপরিহার্য সত্তায় (الْغَيْب) ও আখেরাতে  ঈমান পোষণ করে এবং এ কারণে তারা তাঁকে ভয় করে চলে ও তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য চেষ্টা করে, আর তা করে সহজাত ও বিচারবুদ্ধিজাত ভালো-মন্দের জ্ঞানের ভিত্তিতে আচরণ করে এবং এরই অন্যতম হচ্ছে ছ্বালাত ক্বাএম্ করা ও স্বীয় রিয্ক্ব্ থেকে ব্যয় করা। তবে এখানে যে ছ্বালাতের কথা বলা হয়েছে তা কোরআন মজীদে মুসলমানদেরকে বিশেষ পারিভাষিক অর্থে যে ছ্বালাত্ ক্বাএম্ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে তা থেকে ভিন্ন তথা আভিধানিক অর্থে অর্থাৎ দো‘আ; তারা সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য তাঁর উদ্দেশে যে আবেদন-নিবেদন করে, এমনকি হতে পারে যে, তা কেবল অন্তরে, এটাই তাদের ছ্বালাত্। অন্যদিকে রিয্ক্ব্ থেকে ব্যয় করার বিষয়টিও তাদের ক্ষেত্রে সহজাত জ্ঞান ও বিচারবুদ্ধিজাত জ্ঞানের ভিত্তিতে অন্যদের জন্য ব্যয়, বিশেষতঃ দুঃস্থ, অনাথ ও অভাবীদের জন্য ব্যয় (যদিও এ থেকে নিঃশর্তভাবে ‘ব্যয়’ তথা ‘কার্পণ্য না করা’ অর্থও গ্রহণ করা যেতে পারে)। অন্যদিকে ওয়াহী ও নবুওয়াতের দাও‘আত্ সঠিকভাবে পৌঁছার কারণে অথবা জন্মগতভাবে যারা ওয়াহী ও নবুওয়াতে ঈমানদার তারাই দ্বিতীয় ভাগের অন্তর্ভুক্ত এবং দাও‘আতের কারণেই হোক বা জন্মগত শিক্ষার কারণেই হোক তারা তাওহীদ ও আখেরাতে ঈমানদার। আর তাদের ছ্বালাত্ ক্বাএম, রিয্ক্ব্ থেকে ব্যয় করা ও অন্যান্য করণীয়-বর্জনীয় সংশ্লিষ্ট ওয়াহীর ভিত্তিতে এবং কতক ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়মে ও আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে হয়ে থাকে - যা প্রথমোক্ত ভাগের লোকদের জন্য অপরিহার্য নয়।

এখানে ঈমানের ক্ষেত্রে “আল্লাহ্” শব্দ ব্যবহার না করে “আল্-গ্বায়ব্” শব্দ ব্যবহার থেকে সুস্পষ্ট যে, প্রথম ভাগের মুত্তাক্বীরা ইন্দ্রয়াতীত স্রষ্টা সত্তায় ঈমান পোষণ করলেও তাঁর জন্য “আল্লাহ্” নাম ব্যবহার না-ও করতে পারে, বরং স্বীয় ভাষায় অন্য কোনো নামও ব্যবহার করতে পারে, এমনকি তাঁকে আদৌ কোনো নামে অভিহিত না করে কেবল অন্তরে তাঁর সম্পর্কিত ধারণা পোষণ করতে পারে। এভাবে কোরআন মজীদ “মুত্তাক্বী”র এক বিশ্বজনীন তাৎপর্য উপস্থাপন করেছে।

বস্তুতঃ এ দুই ধরনের লোকেরা যেহেতু ইন্দ্রিয়াতীত অপরিহার্য স্রষ্টাসত্তাকে ভয় করে এবং তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে তার ভিত্তিতে সহজাত ও বিচারবুদ্ধিজাত জ্ঞানের আলোকে করণীয় ও বর্জনীয় নির্ধারণ করে নিয়ে তদনুযায়ী জীবনযাপন ও আচরণ করে সেহেতু নিঃসন্দেহে এরা সত্যানুসন্ধানী এবং কোরআন মজীদ বলছে যে, এ দুই ধরনের লোকেরাই কোরআন মজীদ থেকে হেদায়াত্ লাভ করতে সক্ষম। এর বিপরীতে, যারা এ দুই ভাগের কোনোটিতেই নেই, বরং পার্থিব লাভালাভের ভিত্তিতে উপরোক্ত বিষয়গুলোকে অস্বীকার বা প্রত্যাখ্যান করেছে (যদিও অন্তরে সত্য বলে জানে) তাদের পক্ষে কোরআন মজীদ থেকে হেদায়াত লাভ করা সম্ভব নয়। কারণ, তারা তাদের সহজাত ও বিচারবুদ্ধিজাত জ্ঞানের দাবী পরিত্যাগ করেছে বিধায় তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বিকৃত হয়ে গিয়েছে, ফলে তারা হেদায়াতের উৎস কোরআন মজীদে এমন বিকৃত তাৎপর্য দেখতে পায় যা তাদের পথভ্রষ্টতাকে আরো বৃদ্ধি করে দেয়।

 

একটি প্রশ্ন ও তার জবাব

নিজেকে নাস্তিক হিসেবে পরিচয় প্রদানকারী জনৈক লেখিকা তাঁর ফেসবুক একাউন্টে নিম্নোক্ত স্ট্যাটাস্ পোস্ট্ করেছেন :

 “কোন নবজাত শিশুকে যদি কোন মানবহীন জঙ্গলে রেখে আসা হয় তাহলে পূর্ণ বয়স্ক হয়ে সে কোন্ ধর্ম গ্রহণ করবে? ইসলাম, নাকি হিন্দু ধর্ম, নাকি খৃস্টান? কোন প্রকার সামাজিক পরিবেশের স্পর্শ ছাড়া তার মধ্যে যে ধর্মীয় আচরণ প্রকাশিত হবে সেটাই হবে প্রকৃত স্রষ্টা নির্দেশিত ধর্ম। আর যদি মানুষ প্রাণী হিসেবে তার মধ্যে শুধু মানবীয় বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে তাহলে বুঝা যাবে সে প্রকৃতি প্রদত্ত biological বিধান দ্বারা পরিচালিত; সেখানে কথিত স্রষ্টার কোন হাত নেই। আশা করি আস্তিক ভাইয়েরা যৌক্তিক উত্তর দেবেন।”

জবাব : লেখিকার এ সংক্ষিপ্ত স্ট্যাটাসে বেশ কয়েকটি ভুল আছে যা মোটেই উপেক্ষণীয় নয়। তিনি যখন বলছেন, “সেটাই হবে প্রকৃত স্রষ্টা নির্দেশিত ধর্ম” সেখানে তিনি স্রষ্টার অস্তিত্ব স্বীকার করে নিয়েছেন। আর যখন তিনি বলছেন, “কথিত স্রষ্টার কোন হাত নেই” তখন দৃশ্যতঃ তিনি স্রষ্টার অস্তিত্ব অস্বীকার করছেন বা তাতে সন্দেহ পোষণ করছেন। এখানে তাঁর অবস্থান দ্বৈত না হয়ে সুস্পষ্ট হওয়া উচিত ছিলো।

দ্বিতীয়তঃ তিনি যে বিষয়টি হাযির করেছেন তা কোনো প্রকৃত ও বাস্তব বিষয় নয়, বরং একটি কাল্পনিক বিষয় এবং সবচেয়ে বড় কথা, বাস্তবতার আলোকে তা ত্রুটিপূর্ণ। এখানে তিনি একটি নবজাত শিশুর কথা বলেছেন - যা অবাস্তব। কারণ, কোনো জঙ্গলে একটি নবজাত শিশুকে রেখে এলে (এমনকি সেখানে কোনো মাংসাশী হিংস্র প্রাণী বা অন্য ধরনের কোনো ক্ষতিকর প্রাণী না থাকলেও) শিশুটি বেঁচে থাকতে পারবে না। তাঁর উচিত ছিলো খাদ্য-পানীয়ের ব্যবস্থা এবং শীত, গ্রীষ্ম ও বর্ষার ক্ষতি থেকে রক্ষাকরণ সহ শিশুটিকে বাঁচানোর ও তার নিরাপত্তা বিধানের ব্যবস্থার উল্লেখ করা। তবু আমরা ধরে নিচ্ছি যে, শিশুটির জন্য এ সব ব্যবস্থা এমনভাবে করা হলো যাতে সে বুঝতে না পারে যে, তারই মতো মানুষ (যদিও বয়সে বড়) তার জন্য এ সব কিছু করেছে। তাছাড়া ধর্মমাত্রেরই বিধি-বিধানসমূহের একটি বিরাট অংশ তার পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের আচার-আচরণের সাথে সংশ্লিষ্ট। সুতরাং একটিমাত্র শিশুকে রেখে এলে তার দ্বারা ধর্ম সংক্রান্ত পরীক্ষার কাজটি খুবই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তাই কম পক্ষে দু’টি শিশু - একটি পুরুষ শিশু ও একটি মেয়ে শিশু - রেখে আসার চিন্তা করা উচিত ছিলো।

তৃতীয়তঃ তিনি যে ‘মানবীয় বৈশিষ্ট্য’ কথাটি উল্লেখ করেছেন তা সম্ভবতঃ অসাবধানতাবশতঃ ব্যবহার করেছেন। কারণ, একটি প্রাণী হিসেবে মানুষ যে বানরের চেয়ে উন্নততর প্রাণী তা তার ‘মানবীয়’ বৈশিষ্ট্য নয়, বরং তার মানবীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই যে, সে কেবল সহজাত জ্ঞানের দ্বারা পরিচালিত হয় না, বরং সে জ্ঞান অর্জন করে ও তদনুযায়ী চলে, সে অনুপস্থিত বিষয়াদি এমনকি ইন্দ্রয়াতীত অস্তিত্ব নিয়ে ভাবতে, চিন্তা-গবেষণা করতে ও বিতর্ক করতে পারে। সে কল্পলোকে নব-উদ্ভাবন করতে পারে এবং প্রাকৃতিক বস্তুতে পরিবর্তন সাধন করে তা বাস্তবায়ন করতে পারে। সে স্বীয় সহজাত প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে পারে, যেমন : চরম ক্ষুধার মুহূর্তেও বাধামুক্ত খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকতে পারে। আরো অনেক দৃষ্টান্ত দেয়া চলে।

সুতরাং এটা সন্দেহাতীত যে, মানব শিশু বা মানুষ কেবল biological বিধান দ্বারা পরিচালিত নয়।

চতুর্থতঃ লেখিকার এ পরীক্ষা অর্থহীন এ কারণে যে, মানব প্রজাতির প্রথম মানুষটি বা মানুষদ্বয় নিঃসন্দেহে কোনো মানব সমাজের শিক্ষা দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন না। তা সত্ত্বেও আমরা বর্তমানে মানব সমাজের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ও পরস্পর বিরোধী ধর্ম ও মত-পথ দেখতে পাচ্ছি; তা যখন যে অবস্থায়ই উদ্ভূত হয়ে থাকুক না কেন, এতে সন্দেহ নেই যে, তা পদার্থের বিধি-বিধান বা বায়োলজিক্যাল বিধিবিধান থেকে গড়ে ওঠে নি। কারণ, পদার্থের গতি একমুখীন অর্থাৎ সর্বাবস্থায় একই ক্রিয়ার ফল অভিন্ন হতে বাধ্য। বিশেষ করে পদার্থের কোনো ধরনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া থেকেই চিন্তা, মতপার্থক্য, বিতর্ক, ন্যায়-অন্যায় বোধ, সাহিত্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্ম ইত্যাদি গড়ে উঠতে পারে না, বিশেষ করে স্রষ্টার অস্তিত্বের ধারণা গড়ে উঠতে পারে না। কারণ, স্রষ্টা যদি না-ই থাকবেন তাহলে তা প্রতিক্রিয়া করতে পারে না এবং তার ফলে স্রষ্টার ধারণা গড়ে উঠতে পারে না। বায়োলজিক্যাল বিধিবিধানের ক্ষেত্রেও একই কথা; এ থেকে উপরোক্ত বিষয়গুলো এবং বিচারবুদ্ধি, নব নব জ্ঞান ও উদ্ভাবন, ইত্যাদি উদ্ভূত হতে পারে না।

যা-ই হোক, স্ট্যাটাসটিতে এতো সব ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও বিচারবুদ্ধির দৃষ্টিতে অত্র নিবন্ধকারের জবাব হচ্ছে এই যে, এ ধরনের শিশুটির, শিশুদ্বয়ের বা শিশুদের মধ্যে বিচারবুদ্ধির বিকাশের সাথে সাথে জীবন ও জগতের অন্তরালে নিহিত মহাসত্য সম্পর্কে যে প্রশ্ন জাগ্রত হবে তার ফলে সে বা তারা একজন মহাজ্ঞানময় ও মহাশক্তিধর অপরিহার্য স্রষ্টাসত্তার অস্তিত্ব ও তাঁর সাথে স্বীয় সম্পর্ক অনুভব করবে এবং বিচারবুদ্ধির বিকাশের আরেকটি পর্যায়ে অর্থাৎ বয়ঃপ্রাপ্তির সাথে সাথে সে বা তারা স্বীয় করণীয় ও বর্জনীয়ের ক্ষেত্রে ঔচিত্য ও অনৌচিত্য অনুভব করবে। এছাড়া নিজের মধ্যে আরো অনুভব করবে যে, যে স্রষ্টাসত্তা তাকে সৃষ্টি করেছেন তিনি তাকে মৃত্যুর পরে পুনরায় সৃষ্টি করতেও সক্ষম, বরং সে স্বীয় অপূর্ণ আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য একটি অনন্ত জীবন কামনা করবে এবং অনুভব করবে যে, যে স্রষ্টা তার সমস্ত প্রয়োজন পূরণের অগ্রিম ব্যবস্থা করে রেখেছেন তিনি তার এ আকাঙ্ক্ষাও পূরণ করতে পারবেন, বরং করবেন। এ কারণে, সে স্বীয় সহজাত প্রবণতা ও বিচারবুদ্ধির আলোকে যে সব করণীয় অনুভব করবে সেগুলো করবে এবং যে সব বর্জনীয় অনুভব করবে সেগুলো বর্জন করবে। সে আরো অনুভব করবে যে, সে সহজাত প্রবণতার হাতে বন্দী নয়, বরং তার রয়েছে স্বাধীনতা; সে চাইলে কোনো কাজ করতেও পারে, চাইলে তা থেকে বিরতও থাকতে পারে; সে চাইলে সে যা করণীয় মনে করে তা করতেও পারে, না-ও করতে পারে, তেমনি সে যা কিছু বর্জনীয় মনে করে সে তা বর্জন করতেও পারে, না-ও করতে পারে। এমতাবস্থায় সে সৃষ্টিকর্তার ভয়ে ও তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে কষ্টকর হলেও স্বীয় ঔচিত্য ও অনৌচিত্য বোধ অনুযায়ী চলতে পারে, আবার এ কষ্ট এড়ানো এবং পার্থিব লাভ ও প্রবৃত্তিকে পরিতৃপ্ত করার লক্ষ্যে ঔচিত্য ও অনৌচিত্য বোধ অনুযায়ী না-ও চলতে পারে, এমনকি তার এ আচরণের সপক্ষে ভিত্তিহীন যুক্তি উপস্থাপনের লক্ষ্যে সে স্বয়ং যে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত ধারণার অধিকারী তাঁর অস্তিত্বও অস্বীকার করে বসতে পারে।

কথিত শিশু বা শিশুদ্বয় বা শিশুরা বয়ঃপ্রাপ্ত হবার পর যদি তার বা তাদের সহজাত ও বিচারবুদ্ধিজাত ঔচিত্য ও অনৌচিত্য দ্বারা পরিচালিত হয় তাহলে কোরআন মজীদের দৃষ্টিতে সে বা তারা মুসলিম, এমনকি তার বা তাদের সাথে ‘আল্লাহ্’, ‘ইসলাম’, ‘মুসলিম’ ইত্যাদি শব্দের সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও - যার প্রমাণ ওপরের নিবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু সে কোন্ পথ অবলম্বন করবে সে সম্বন্ধে কারো পক্ষেই অগ্রিম ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব নয়, কারণ, সে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ও এখতিয়ারের অধিকারী সৃষ্টি - যা আসলে জীবন ও জগতের পিছনে নিহিত অপরিহার্য সত্তা সহাজ্ঞানময় সৃষ্টিকর্তার বৈশিষ্ট্য; তিনি মানুষের ভিতরে এ বৈশিষ্ট্যেরই ছায়াপাত ঘটিয়েছেন। কোরআন মজীদে এরশাদ হয়েছে : فِطْرَةَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا  - “আল্লাহর প্রকৃতি - যার ওপরে তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন।” (সূরাহ্ আর্-রূম : ৩০)

লিখেছেন :নুর হো

  41
  0
  0
امتیاز شما به این مطلب ؟

latest article

নবীবংশের অষ্টম নক্ষত্র ইমাম রেযার (আ) ...
বিভিন্ন ফিকাহর দৃষ্টিতে রোযা
ইমাম জয়নুল আবেদিন (আ.)
হযরত মুসা (আ.)'র মু'জিজার কাছে ফেরাউনের ...
যুগের ইমাম সংক্রান্ত হাদীসের ওপর ...
১০ ই মহররমের স্মরণীয় কিছু ঘটনা ও ...
সূরা ইউনুস;(৬ষ্ঠ পর্ব)
হুজুর (সা.)-এর সন্তান-সন্ততিগণ
আদর্শ মানব হযরত মুহাম্মদ (সা.) - ৩য় পর্ব
কোরআন ও চিকিৎসা বিজ্ঞান

 
user comment