বাঙ্গালী
Tuesday 24th of April 2018
code: 81241

ইমাম সাজ্জাদ (আঃ) : মহান এক শিক্ষক

ইমাম সাজ্জাদ (আঃ) : মহান এক শিক্ষক

ইমাম সাজ্জাদ (আঃ) : মহান এক শিক্ষক

ইমাম সাজ্জাদ(আঃ) এর শাহাদত বার্ষিকী উপলক্ষ্যে আপনাদের সবার প্রতি রইলো আন্তরিক সমবেদনা।

ইমাম সাজ্জাদ (আঃ) জন্মগ্রহণ করলেন যেন ফেৎনা-ফাসাদপূর্ণ অন্ধকার সময়ের মাঝে ইসলামের মুক্তির আলো জ্বালিয়ে রাখতে পারেন,যে আলোর সাহায্যে তাঁর পিতা ইমাম হোসাইন (আঃ) এর বৃহৎ লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও কর্মসূচিগুলো অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাওয়া যায়। ইমাম সাজ্জাদ (আঃ) ঐশী আলো এবং পিতা ইমাম হোসাইন (আঃ) এর ছত্রছায়ায় বেড়ে উঠে নিজেকে সর্বোচ্চ ফযীলতের ঐশ্বর্যে অলংকৃত করেন। তাঁর জীবনের ২৩ বছরের বেশি সময় না পেরুতেই পিতা ইমাম হোসাইন (আঃ) এর জীবনে নেমে আসে কারবালার সেই ঐতিহাসিক বিপর্যয়কর ঘটনা। কিন্তু ইমাম সাজ্জাদ(আঃ) অসুস্থতার কারণে কারবালার সেই মহাদুর্যোগপূর্ণ ঘটনায় অংশ নিতে পারেন নি। ইতিহাস থেকে প্রমাণিত যে এই ব্যাপারটি আসলে আল্লাহর ইচ্ছাতেই ঘটেছে অর্থাৎ ইমাম সাজ্জাদকে জীবিত রাখার স্বার্থে তাঁর অসুস্থতার ব্যাপারটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে। কারণ আল্লাহ চেয়েছেন ইমাম হোসাইন(আঃ) এর শাহাদাতের পর তিনি যেন ইসলামের পতাকা উড্ডীন রাখেন।

ইমাম সাজ্জাদ (আঃ) এর জীবনকাল কেটেছে এমন একটা সময়ে যখন আহলে বাইতের জন্যেই পরিস্থিতি ছিল খুবই কঠিন এবং প্রতিকূল। এ রকম এক সংবেদনশীল সময়ে উমাইয়া বংশীয় খলিফারা চেয়েছিল জনগণের কাছে নবীজীর আহলে বাইতের মর্যাদা হ্রাস করতে। সেই লক্ষ্যে তারা ইমাম সাজ্জাদ (আঃ) সহ সমগ্র আহলে বাইত এবং তাঁদের অনুসারীদের ওপর কঠোরতা আরোপ করে। সেজন্যে ইমাম বাধ্য হয়েছিলেন শাসকদের প্রচারিত সকল বিভ্রান্তি থেকে জনগণকে মুক্তি দেওয়ার লক্ষ্যে সংগ্রাম করতে। তিনি প্রকৃত ইসলামের বার্তা জনগণের সামনে তুলে ধরে উমাইয়াদের বিকৃতি সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করে তোলেন। ইমাম সাজ্জাদ অবশ্য পিতার শাহাদাতের পর কী বন্দীজীবন আর কী কারবালা বিপর্যয় পরবর্তীকাল-সবসময়ই তিনি অন্যায় এবং জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
অত্যন্ত সচেতনভাবে এবং সুকৌশলে ইমাম হোসাইন (আঃ) এর কারবালা বিপ্লবের স্মৃতিকে জনগণের মাঝে জাগ্রত রাখার মহান কাজটি আঞ্জাম দিয়েছেন।ইমাম হোসাইন (আঃ) কেন কারবালায় শাহাদাতবরণ করলেন,কী ছিল তাঁর মিশন-সেইসব গূঢ়ার্থ এবং মূল্যবোধগুলো জনগণের সামনে ব্যঅখ্যা-বিশ্লেষণ করতেন ইমাম সাজ্জাদ (আঃ)। সেইসাথে ইসলামের উচ্চতর স্বরূপ তুলে ধরা এবং সকল প্রকার বিচ্যুতি ও বেদআতের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তার কথা জনগণের সামনে তুলে ধরা তাঁর একান্ত কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত ছিল।

সাজ্জাদ মানে হলো যিনি অনেক বেশি বেশি সিজদাহ করেন। এটা ছিল তাঁর অনেকগুলো উপাধির একটি। আল্লাহর ইবাদাতের ক্ষেত্রে ইমাম সাজ্জাদ (আঃ) ছিলেন অত্যন্ত নিষ্ঠাবান এবং সদাসচেষ্ট। তাঁর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলো কাটতো আল্লাহর সাথে একান্তে এবং নিঃসঙ্গ মুহূর্তে আপন প্রয়োজনীতার কথা পেশ করার মধ্য দিয়ে। তৎকালীন একজন প্রসিদ্ধ আবেদ ছিলেন হাসান বসরি। তিনি বলেছেন-একদিন আল্লাহর ঘরের পাশে ইবাদাত করছিলাম। দেখলাম আলী ইবনে হোসাইন অর্থাৎ ইমাম সাজ্জাদ (আঃ) আল্লাহর ইবাদাতে মশগুল আছেন। তাঁর ইবাদাতের ভঙ্গি বা ধরন ছিল খুবই আকর্ষণীয়। তাঁর কথাবার্তা এতো বেশি মনোমুগ্ধকর ছিল যে,আনমনেই তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে গেলাম।'

বর্ণিত আছে যে,একদিন উমাইয়া শাসক হিশাম ইবনে আব্দুল মালেক আল্লাহর ঘর যিয়ারত করতে এসে মক্কায় প্রবেশ করলেন এবং মানুষের ব্যাপক ভিড় হবার কারণে তাওয়াফ করতে গিয়ে হাজ্বরে আসওয়াদ বা বিখ্যাত কালো পাথরটি ছুঁতে পারেন নি। তিনি মাসজিদুল হারামের এক কোণে একটি উঁচু আসনে বসলেন। ঠিক সে সময় ইমাম সাজ্জাদ (আঃ) মাসজিদুল হারামে প্রবেশ করে তাওয়াফ শুরু করলেন। যখন তিনি হাজ্বরে আসওয়াদের কাছে পৌঁছলেন মানুষ তাঁর নূরানী চেহারা দেখে দেরি না করে রাস্তা ছেড়ে দিলেন যাতে ইমাম হাজ্বরে আসওয়াদ স্পর্শ করতে পারে। হিশাম ইবনে আব্দুল মালেকের সাথে সিরীয় এক সফরসঙ্গী ছিল,সে জিজ্ঞেস করলো-ঐ লোকটিকে যে সবাই এতো শ্রদ্ধা-সম্মান করে-কে সে? ইমাম সাজ্জাদ (আঃ) কে চিনে ফেলার ভয়ে হিশাম লোকটিকে মিথ্যা জবাব দিয়ে বললো-আমি তাকে চিনি না। বিখ্যাত আরব কবি ফারাযদাক সেখানে ছিলেন। তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন-আমি চিনি তাকে। তারপর একটা চমৎকার কবিতায় ইমাম সাজ্জাদ (আঃ) এর পরিচয় তুলে ধরলেন। যার বক্তব্যটা ছিল এ রকমঃ ইনি সেই ব্যক্তি মক্কার পথে-ঘাটে যাঁর পায়ের নিচের নুড়ি-পাথরও তাঁকে চেনে। তিনি অত্যন্ত ভদ্র ও নম্র স্বভাবের লোক। সহনশীলতা এবং মহত্ত্ব তাঁর চরিত্রের মহান দুটি অলংকার। কখনোই তিনি ওয়াদা খেলাফ করেন না।তাঁর অস্তিত্ব সবার জন্যেই পবিত্র ও কল্যাণময়। তাকওয়াবানদের যদি গুণতে হয় তাহলে তিনি হবেন সেই তালিকার শীর্ষস্থানীয়। যদি কেউ প্রশ্ন করে আল্লাহর যমিনে শ্রেষ্ঠ মানুষটি কে? তাহলে তাঁকে দেখিয়ে দেওয়া যায়। তাকে যদি না চেনো তাহলে আমি বলবো তিনি হলেন ফাতেমা (সা) এর সন্তান এবং সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর প্রিয় উত্তরপুরুষ।


যেমনটি সবাই জানেন যে দোয়া হচ্ছে স্রষ্টা এবং সৃষ্টির মাঝে সম্পর্ক সেতু নির্মাণের আধার। সেজন্যে ইসলামে এ সম্পর্কে ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দোয়া মানুষের মনের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে যার প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায় সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে। খোদার সাথে সম্পর্ক মানুষকে আত্মিক ক্ষতি থেকে সুরক্ষিত করে। ইমাম সাজ্জাদ (আঃ) ইসলামকে যেসব পন্থা ও কৌশলে জনগণের কাছে প্রচার করেছেন তার মধ্যে এই দোয়া এবং ইবাদাতের সংস্কৃতি ছিল অন্যতম একটি মাধ্যম। তিনি তাঁর গুরুত্বপূর্ণ বহু লক্ষ্য-উদ্দেশ্য চিত্ত্বাকর্ষক দোয়া ও মুনাজাতের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। তাঁর সেইসব দোয়া সহিফায়ে সাজ্জাদিয়া নামের একটি সংকলনে বিধৃত হয়েছে। ইসলামের বিধি-বিধানসহ বিভিন্ন বিষয়ে জানার জন্যে এই সংকলনটি জ্ঞানসিন্ধুর মতো। সুযোগ হলে গ্রন্থটি পাঠ করতে ভুলবেন না।

ইমাম সাজ্জাদ (আঃ) ছিলেন অসম্ভব দয়ালু। জনগণকে সাহায্য-সহযোগিতা করার ব্যাপারে তিনি খুব গুরুত্ব দিতেন। ক্ষুধা-দারিদ্র্যের কারণে রাতে যাদের চোখে ঘুম আসতো না,তিনি তাঁর আত্মপরিচয় গোপন রেখে তাদের জন্যে খাবারের ব্যবস্থা করতেন।দিন পেরিয়ে রাতের আঁধার নেমে আসলেই তিনি মদীনার অভাবগ্রস্তদের ঘরে ঘরে খাবার নিয়ে হাজির হতেন। তাঁর এই বদান্যতা ইতিহাসখ্যাত। ইমাম সাজ্জাদ (আঃ) এর সমসাময়িক একজন বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন যাহরি। তিনি বলেন,বৃষ্টিশীতল এক রাতে ইমাম সাজ্জাদ (আঃ)কে অন্ধকারে দেখতে পেলাম পিঠের পরে বস্তা নিয়ে কোথায় যেন যাচ্ছেন। বললাম হে রাসূলে খোদার সন্তান! তোমার পিঠে এটা কিসের বোঝা? তিনি বললেন সফরে বেরুতে চাচ্ছি তো তাই কিছু পাথেয় নিয়েছি। বললাম-আমার গোলাম তো এখানেই আছে,সে আপনাকে সাহায্য করতে পারবে। ইমাম বললেন- না,আমি নিজেই বোঝাটা বহন করতে চাই। যাহরি বলেন- এই ঘটনার পর কয়েকদিন কেটে গেল কিন্তু ইমাম সফরে গেলেন না। ইমামের সাথে দেখা হলে বললাম- সফরে যে যেতে চাইলেন যান নি? ইমাম বললেন-হে যাহরি! সফর বলতে তুমি যা ভেবেছো আসলে এই সফর সেই সফর নয়। বরং আমি সফর বলতে আখেরাতের সফর বুঝিয়েছি। এই সফরের জন্যে প্রস্তুতি নাও। এই সফরের প্রস্তুতি হলো গুনাহ থেকে দূরে থাকা এবং সৎ কাজ করা। ততোক্ষণে যাহরি বুঝলো যে ইমামের উদ্দেশ্য কী ছিল এবং ইমাম ঐ যে বোঝাটি বহন করছিলেন,তা ছিল অভুক্তদের জন্যে খাবারের বোঝা।

পাঠক! মানুষের দু'ধরনের ক্ষুধা থাকে। একটি দৈহিক এবং অপরটি আত্মিক বা আধ্যাত্মিক। দৈহিক ক্ষুধা মেটানোর জন্যে খাবার গ্রহণ করতে হয়। আর অন্তর বা আধ্যাত্মিক ক্ষুধা মেটানোর জন্যে প্রয়োজন পড়ে ঈমান,জ্ঞান এবং মারেফাতের। এই ক্ষুধার চাহিদা মেটানোর খাদ্য হলো দোয়া এবং ইবাদাত। আমরা ইমাম সাজ্জাদ (আঃ) এর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে জীবনকে ইবাদাতের সৌন্দর্য দিয়ে সাজাবার চেষ্টা করবো-এই হোক তাঁর শাহাদাত বাষির্কীতে আমাদের সবার আন্তরিক প্রত্যয়।

latest article

  আশুরার ঘটনাবলীঃ যুদ্ধের ময়দানে ...
  নামাজ : আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের ...
  যয়নাব (আ.) এর কন্ঠস্বর এখনো অনুরণিত
  হযরত আলী (আ.) এর মর্যাদা
  হযরত ফাতিমাতুয যাহরার (সা.আ.) তসবিহ
  শ্রেষ্ঠ নারী হযরত ফাতিমাতুয যাহরা ...
  ফাতেমা (সা.) এর বিভিন্ন দোয়াঃ
  নারীকুল শিরোমনী হযরত ফাতেমার (সা.আ.)
  হযরত ফাতেমার প্রতি নবী (সা.)-এর স্নেহ ও ...
  জগতের আলো ফাতিমা জাহরা (সা.আ.)'র অলৌকিক ...

user comment

بازدید ترین مطالب سال

انتخاب کوفه به عنوان مقر حکومت امام علی (ع)

حکایت خدمت به پدر و مادر

داستانى عجيب از برزخ مردگان‏

فلسفه نماز چیست و ما چرا نماز می خوانیم؟ (پاسخ ...

رضايت و خشنودي خدا در چیست و چگونه خداوند از ...

چگونه بفهميم كه خداوند ما را دوست دارد و از ...

سخنراني مهم استاد انصاريان در روز شهادت حضرت ...

مرگ و عالم آخرت

در کانال تلگرام مطالب ناب استاد انصاریان عضو ...

نرم افزار اندروید پایگاه اطلاع رسانی استاد ...

پر بازدید ترین مطالب ماه

سِرِّ نديدن مرده خود در خواب‏

ذکری برای رهایی از سختی ها و بلاها

آیه وفا (میلاد حضرت عباس علیه السلام)

سرانجام كسي كه نماز نخواند چه مي شود و مجازات ...

رمز موفقيت ابن ‏سينا

تنها گناه نابخشودنی

اهمیت ذکر صلوات در ماه شعبان

بهترین دعاها برای قنوتِ نماز

رفع گرفتاری با توسل به امام رضا (ع)

آیا حوریان و لذت های بهشتی فقط برای مردان است؟

پر بازدید ترین مطالب روز

با این کلید، ثروتمند شوید!!

حاجت خود را جز نزد سه نفر نگو!!

طلبه ای که به لوستر های حرم امیر المومنین ...

چند روايت عجيب در مورد پدر و مادر

فرق كلّي حيوان با انسان در چیست ؟

آيا فكر گناه كردن هم گناه محسوب مي گردد، عواقب ...

چگونه بفهیم عاقبت به خیر می‌شویم یا نه؟

چرا باید حجاب داشته باشیم؟

چگونه دوست خدا شویم؟

تقيه چيست و انجام آن در چه مواردي لازم است؟