বাঙ্গালী
Monday 23rd of April 2018
code: 80690

মানুষ ও তার সৃষ্টিরহস্য (আত্মপরিচিত)

মানুষ ও তার সৃষ্টিরহস্য (আত্মপরিচিত)

সৃষ্টিতত্ত্বের রহস্য বা আত্মপরিচিতি মুলক জ্ঞান প্রতিটি ব্যক্তির জন্য একটি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অত্যন্তজরুরী বিষয়। কেননা প্রতিটি ব্যক্তি তার নিজের অবস্থান, ক্ষমতা, সূচনা এবং শেষ পরিণতি বা গন্তব্য সম্পর্কে জ্ঞান না রাখলে সে নিজের কল্যাণ ও অকল্যাণ সম্পর্কে কোন সিদ্ধান্তই নিতে পারবে না। তাই আমাদেও নিজ সত্তার অস্তিত্ব সম্পর্কে কোন ধরণের সিদ্ধান্ত নিতে হলে আমাদের সর্বপ্রথম দায়িত্ব হল তার সম্বন্ধে যথাযথ জ্ঞান লাভ করা।
একইভাবে আমরা এই বিশাল সৃষ্টিজগতের একটি সৃষ্টজীব যে নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করিনি বরং তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আমি যদি নিজেকে সৃষ্টি করতাম তাহলে অবশ্যই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি রূপে তৈরী হতাম। অথচ আমি তেমনটি নই। শুধু তাই-ই নয় আমার বর্তমান অস্তিত্বকে যদি আমিই সৃষ্টি করে থাকবো তাহলে আমার এই সৃষ্টির পূর্বে আমার অস্তিত্ব অনিবার্যবশত থাকতে হবে; যা সম্পূর্ণ রূপে একটি অসম্ভব কল্পনা।
এমনকি আমরা যদি মনে করি আমাদের মত কোন সৃষ্টি আমাকে অস্তিত্ব দান করেছে সেক্ষেত্রেও ঐ একই প্রশ্নের সম্মুখীন হব। যে সত্তা আপন অস্তিত্ব লাভে অন্যের মুখাপেক্ষী সে কিভাবে তার মত অন্য একটি অস্তিত্বকে সৃষ্টি করবে ? আর যদি এমনটি ধারণাও করি যে অন্য একটি সৃষ্টি তাকে অস্তিত্ব দান করেছে; এভাবে সৃষ্টি পরম্পরায় অপর সৃষ্টিকে অস্তিত্ব দান করে আসছে। তাহলে প্রথম সৃষ্টিকে কে অস্তিত্ব দান করলো ; এপ্রশ্ন থেকেই যাবে। এভাবে এই সৃষ্টিচক্র এক পর্যায়ে যেয়ে অবশ্যই পরিসমাপ্ত হতে হবে নতুবা এটা হবে একটি দুষ্ট চক্র যা দর্শনে বাতিল যুক্তি বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। আর এছাড়া সৃষ্টি অর্থই হচ্ছে যা এক সময় ছিল না এবং এক সময় আবার থাকবে না। তাই এই অস্তিত্ব প্রদানে এমন এক মহাশক্তির প্রয়োজন যে এই সৃষ্টি সমূহের পূর্বে থাকবে এবং সৃষ্টি সমুহের স্থায়ীত্ব কালব্যাপীও তাকে থাকতে হবে।
এমন কি যদি বস্তুবাদীদের মত ধারণাও করি যে মানুষ প্রকৃতির সৃষ্টি। তাহলে আমরা যে প্রশ্নগুলোর সম্মুখীন হব তাহল প্রকৃতিকে কে অস্তিত্ব দান করলো? এ ক্ষেত্রে আরও একটি প্রশ্ন হচ্ছে সৃষ্টির বৈশিষ্ট্যগুলো স্রষ্টার মধ্যে অবশ্যই পূর্ণরূপে অবস্থান করতে হবে। অথচ মানুষের মধ্যে যে বৈশিষ্ট্যগুলো আছে তার অধিকাংশই প্রকৃতির মধ্যে নেই। প্রকৃতি হল সম্পূর্ণরূপে বস্তুসত্তা আর মানব প্রকৃতিতে বস্তুসত্তা বর্হিভূত অনেক বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। প্রকৃতি বা বস্তু অর্থ আধাঁর/ আড়াল তাই বস্তুর বৈশিষ্ট্য হল সে তার নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত নয়। আর এক্ষেত্রে মানুষকে বলা হয় স্বজ্ঞেয় সত্তা যে তার নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত আছে বা জ্ঞান রাখে।
'নরম নধহম্থ বিরাট বিস্ফোড়নের সূত্রও আরেকটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক কল্পনা বৈ ভিন্ন কিছু নয়। এটা বস্তুবাদী জ্ঞানের চুড়ান্ত ফল হিসেবে প্রতিফলিত হয়েছে। এবিষয়টি এমন একটি তথাকথিত বুদ্ধিমান মানুষদের ধরণা যারা নিজেদেরকে বিশ্বে জ্ঞান-বিজ্ঞানের ধারক বলে মনে করেন। তাদের সূত্রের সংক্ষিপ্ত রূপ হল বিশ্বে কোন কিছুই ছিল না হঠাৎ মহা বিস্ফোড়ন ঘটে এই মহা জগতের সৃষ্টি হয়েছে। এধরণের যুক্তিশুন্য কথা রাজার নতুন পোষাকের মত জ্ঞানীদেরও বোকা বানিয়ে দিয়েছে। এক্ষেত্রে প্রথম প্রশ্ন হল, মহাশুন্য কথার কোন বাস্তব রূপ আছে কি ? বা মহাশুন্যের কোন অস্তিত্ব আছে কি ? বস্তুজগতে [বস্তুবাদী চিন্তায়] কোন মহাশুন্য কল্পনা করা সম্ভব কি ? আদৌ সম্ভব নয়। কেননা তাদের ধারণা অনুযায়ী বস্তুর বাইরের কোন অস্তিত্ব সমান অনাস্তিত্ব । তাই এধারণা অনুযায়ী 'কিছুই ছিল না' থেকে 'সব কিছু হয়েছে' এটা ঘোড়ার ডিমের মত বিষয় যে, ঘোড়া কখনো ডিম পাড়ে না; কিন্তু একবারই একটা ডিম পেড়েছে।
আরো মজার ব্যাপার হলো তাদের কথা অনুযায়ী কোন কারণ ছাড়া কার্য সংঘটিত হয় না। অথচ এক্ষেত্রে তারা বোকার মত গ্রহণ করে নিয়েছেন যে এই একটি ঘটনায় কোন কারণের প্রয়োজন পড়েনি।
অতএব বস্তুবাদীদের বস্তুর সীমানায় সৃষ্টিজগতের সূত্র নিয়ে এর বেশী ব্যাখ্যা প্রদান আদৌ সম্ভব নয়। এমনকি যদি ধরেও নেয়া হয় যে বর্তমান বিশ্ব একটি বিরাট বিস্ফোড়নের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে তাতে ইসলামী ধারণার কোন অসুবিধা নেই। কেননা ইসলামী চিন্তায় যে বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে তা'হল বিষ্ফোড়ন হোক আর যাই হোক না কেন এর পিছনে স্রষ্টার পরিকল্পিত শক্তি কাজ করেছে।
তাই একটি বিষয় আমাদের কাছে স্পষ্ট যে এই বিস্ফোড়ন সংঘটিত হওয়ার পূর্বে এমন কোন অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকতে হবে যে অস্তিত্ব তার বিজ্ঞবান পরিকল্পনার ভিত্তিতে এ বিস্ফোড়ন ঘটিয়েছেন।
শেষের এই ধারণাটুকু উপরের ধারণার সাথে সংযুক্ত করলে বিষয়টি সম্পূর্ণ যুক্তির ছকে দাড় করানো সম্ভব। নতুনা বিষ্ফোড়নের সূত্র রাজার নতুন পোষাক গল্পে ছোট শিশুর মতো ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের মানুষরাও এই সূত্রের তথাকথিত জ্ঞানীদের মুখোশ উন্মোচন করতে সক্ষম। অবশ্য শেষোক্ত ধারণাটুকু তাদের কাছে প্রত্যাশা করা চলে না। কেননা এটা সম্পূর্ণ বস্তুবাদী বিশ্বের বাইরের কথা তাই এই কথায় তাদের আসতে হলে বস্তুর সীমানা পাড়ী দিয়ে আসতে হবে।
একথাগুলো উল্লেখ করার একমাত্র উদ্দেশ্য হল মহান স্রষ্টা অতি সুন্দর পরিকল্পনায় এ বিশ্বকে সাজিয়েছেন। আর এই বিশ্বের রাজমুকুট স্বরূপ সৃষ্টি করেছেন মানুষকে। এজন্য আল্লাহ বলেছেন আমি ভূ-পৃষ্ঠে আমার প্রতিনিধি পাঠাতে চাই। অতএব এই মানুষের প্রকৃত অবস্থান হল 'মাকামে খালিফাতুল্লাহ্' অর্থাৎ সে সৃষ্টিজগতে মহান স্রষ্টার প্রতিনিধিত্ব করবে।
সৃষ্টিজগতের মানগত স্তর
সৃষ্টি জগতকে তার মানগত স্তরের দিক থেকে চারটি স্তরে শ্রেনীবিন্যাশ করা হয়ে। এই স্তরগুলোর ধারাবাহিক ক্রমপর্যায়ের ভিত্তিতে উপরের চিত্রটি সাজানো হয়েছে। এখন মানুষ যদি পাশবিক স্তর অর্জনের জন্য দিনরাত চেষ্টা করে তাহলে সে নিজকেই অবমুল্যায়ণ করলো। কেননা পাশবিক স্তর হল তার স্তর থেকে নিম্ন পর্যায়ের অবস্থানের সৃষ্টি। আর এজন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি তার যথার্থ অবস্থান সম্পর্কে অবগত আছে সে মুক্তি পাবে।
মহান আল্লাহ বলেন : আমি ভূ-পৃষ্ঠে আমার প্রতিনিধি পাঠাতে চাই।
সৃষ্টিকুলের শ্রেষ্ঠজীব মানুষকে মহান আল্লাহ্ তায়ালা অত্যন্ত সম্মান এবং ভালবাসার পরশে সৃষ্টি করেছেন। তিনি বলেন ঃ নিশ্চয় আমি আদম-সন্তানকে অতি মর্যাদা দান করেছি। [বনি ইসরাইল ঃ ৭০] । তিনি আরো বলেন ঃ আমি স্বহস্তে তোমাকে সৃষ্টি করেছি [সুরা সোয়াদ ঃ ৭৫] এই মানুষকে পৃথিবীতে চলার সকল উপযুক্ত উপকরণ তিনি দান করেছেন। তাকে দিয়েছেন শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও অন্তর। যাতে সে এধরাতে যথাযথভাবে বসবাস করতে পারে এবং ন্যায়-অন্যায় সত্য মিথ্যাকে পৃথক করে তার উন্নতির পথে যাত্রা করতে পারে।
এই মানুষের জন্যই মহান স্রষ্টা পৃথিবীকে এত সুন্দর করে সুসজ্জিত করেছেন। যার মাথার উপরে অবস্থান করছে বিষ্ময়কর চন্দ্রসূর্য ও নক্ষত্র খোচিত বিশাল আসমান আর পদতলে সুজলা সুফলা শস্য শ্যামল আবাদ ও বসবাস যোগ্য তৃণভুমি। আর আসমান ও জমীনের মাঝখানে অবস্থান করছে বিভিন্ন স্তরের এক মহাবায়ূমন্ডল। এসব কিছুই মানবজাতির প্রতি মহান স্রষ্টার অসীম অনুগ্রহ ও সম্মানেরই প্রকাশ যা শুধু তার সকল চাহিদা পুরনের জন্যই প্রস্তুত করা হয়নি বরং মানুষের অস্তিত্বগত মর্যদার কারণেই এ বিশাল আয়োজন করা হয়েছে। এপ্রসঙ্গে একটি কুদসী হাদীসে এভাবে বর্ণিত হয়েছে ঃ 'হে মানব সন্তান আমি যাকিছু সৃষ্টি করেছি সবই তোমার জন্য আর তোমাকে সৃষ্টি করেছি কেবল আমার জন্য।'
আবার এই মানব জাতিকেই তার উন্নতির পথে চরম পূর্ণত্ব লাভের জন্যই মহান আল্লাহ যুগে যুগে অসংখ্য মহাপুরুষ পাঠিয়েছেন। এই মহাপুরুষগণ সকল প্রতিকুল পরিবেশের মধ্যে অসহনীয় কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করে নিজ জীবনকে উৎস্বর্গ করে দিয়েছেন একমাত্র মানব জাতির জীবনে কল্যাণকামী ও উন্নয়নমুখী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে।
পবিত্র কুরআনে মানুষ সৃষ্টির মৌলিক ও চুড়ান্ত লক্ষ্য সম্পর্কে মহান স্রষ্টা বলেন ঃ আমি জ্বীন ও মানবকে একমাত্র আমার বান্দেগী করার জন্যই সৃষ্টি করেছি। [সুরা যারিয়াত ঃ ৫৬] ইবাদত শব্দটি আবদ্ শব্দ থেকে উৎপত্তি ঘটেছে আর আবদ্ শব্দের অর্থ হলো দাসত্ব করা। ঐ ব্যক্তিকে আবদ্ বলা হয় যে তার সমগ্র অস্তিত্বকে আপদমস্তক তার প্রভুর আদেশ পালনে সদাপ্রস্তুত রাখে এবং সে তার মালিকের ইচ্ছার বাইরে নিজ ইচ্ছায় কোন কিছু করে না। অতএব মহান স্রষ্টা জ্বীন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এজন্যই যে তারা সকলক্ষেত্রে তাদের প্রভুর ইচ্ছার প্রকাশ ঘটাবে। আর এই দাসত্ব বা নিজ ইচ্ছাকে স্রষ্টার ইচ্ছায় রূপান্তর করার মাধ্যমে জ্বীন ও মানব তাদের চুড়ান্ত লক্ষ্যে [কামালে] উপনীত হয়ে থাকে। ইমাম হাসান (আ.) বলেন ঃ কেউ যদি আল্লাহর ইচ্ছার সম্মুখে অবনত হয় তাহলে আল্লাহ সমগ্র অস্তিত্বকে তার ইচ্ছাধীন করে দেন। [ একসাদ ওয়া পাঞ্জ মৌজু আজ কুরআনে কারীম ওয়া হাদীসে আহলে বাইত, পৃ.১৬১] যখন বান্দা তার প্রভু ইচ্ছার সম্মুখে নিজ ইচ্ছাকে বিলীন করে দেয় তখন এই বান্দা তার প্রভুর প্রভুত্ব প্রকাশের মাধ্যমে পরিণত হয়ে যায়। আর এভাবে বান্দা তার প্রভুর ইচ্ছানুযায়ী সমগ্রসৃষ্টিজগতে প্রতিনিত্বের মাকামে অধীষ্ট হতে পারে। ইমাম সাদিক (আ.) বলেন ঃ বান্দেগী এমন এক সত্তা যার হক্বীকত হল প্রভুত্ব তাই বান্দেগীতে যা বিলীন করা হয় প্রভুত্বে তা অর্জিত হয় আর প্রভুত্বে যাকিছু গোপন থাকে তা ইবাদতের মাধ্যমে হাতে আসে ['মিসবাহুশ শারীয়াহ্' অনুবাদক ১০০ নম্বর অধ্যায়]/মিযান আল হিকমাহ্ ১১৬১৭ নম্বর হাদীস।
আর এজন্যই বান্দার সিজদাবনত অবস্থাকে বান্দেগী প্রকাশের সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যম স্বরূপ পরিচয় দেয়া হয়েছে। ইমাম সাদিক (আ.) বলেন ঃ ইবাদতের চুড়ান্ত রূপ হল সিজদা [মিজানুল হিকমাহ্ ঃ ৫ম খন্ড ২৩৮০ পৃ.] ইমাম রেজা (আ.) বলেন ঃ বান্দার সাথে তার প্রভুর সর্বাধিক নিকটতম সময় হল যখন সে বান্দা সিজদাবনত থাকে ; এটা মহান প্রভুর কথা যে তিনি [সুরা আলাকের ঃ ১৯] বলেন ঃ সিজদাবনত হও এবং [আল্লাহর] নৈকট্য লাভ কর [উইনু আখবার আর রেজা; ২/৭/১৫]।
ইমাম আলী (আ.) প্রকৃত সিজদার ব্যাখ্যা এভাবে দিয়েছেন; তিনি বলেন ঃ দৈহিক সিজদার অর্থ হল বিশুদ্ধ নিয়াতে বিনয় ও বিনম্র অন্তরে কপালের একাংশ মাটিতে রাখা এবং হস্তদ্বয়ের তালু ও পা দ্বয়ের আগুলের অগ্রভাগ ভুপৃষ্ঠে রাখা। আর আধ্যাত্মিক সিজদা হল ; নিজের মনকে নশ্বর বিষয়বলী থেকে মুক্ত করে যাকিছু অবিনশ্বর তার প্রতি নিজের সমস্ত অস্তিত্ব নিয়ে ধাবিত হওয়া এবং অহংকার ও আমিত্বের পরিচ্ছদ খুলে সকল [গুরারুল হিকাম ; ২২১০-২২১১পৃ.]
তিনি সিজদার অর্থের ব্যাখ্যায় আরো বলেন ঃ সিজদার অর্থ হলো আমাকে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে আর সিজদা থেকে মাথা উঠানোর অর্থ হলো আমাকে মাটি থেকে অস্তিত্ব দান করা হয়েছে। দ্বিতীয় সিজদার অর্থ হলো আমাকে পুণরায় মাটিতে পরিণত করা হবে আর দ্বিতীয় সিজদা থেকে মাথা উঠানোর অর্থ হলো পুর্নবার আমাকে মাটি হতেই আর্বিভূত করা হবে। [মিযানুল হিকমাহ্ ৮২৭৭ নম্বর হাদীস]
এমন কি সিজদার অবস্থায় মানুষের চক্ষুদ্বয় পৃথিবীর বস্তুসামগ্রীকে পশ্চাতে রেখে আল্লাহর সানি্নধ্যে সে অবনত হয়।[ মিসবাহু শারিয়া ১০৮ পৃ.]
অতএব মানব সৃষ্টি লক্ষ্য হল মহান স্রষ্টার দাসত্ব করা আর এই দাসত্বের মাধ্যমেই সে তার স্রষ্টার অনুমতিক্রমে প্রতিনিধি স্বরূপ সৃষ্টি জগতে প্রভুত্ব করতে শেখে। কামালে মুতলাক-এর ইবাদত করার অর্থ হল নিজকে সেদিকে ধাবিত করা বা কামালে মুতলাকের দিকে নিজের যাত্রাকে নিবদ্ধ করা। প্রভুর নৈকট্য লাভের অর্থ এই নয়, যে মানুষ তার প্রভুর সাথে স্থানগত বা দৈহিক নৈকট্য লাভ করবে? না, আদৌ এটা লক্ষ্য নয় বরং প্রভুর বৈশিষ্ট্যসমূহ অর্জন করে নিজকে [হাদীস অনুযায়ী খোদায়ী বৈশিষ্ট্যে নিজকে শোসভিত কর] ঐশী গুণে গুণাম্বিত করার মাধ্যমে আমরা প্রভুর প্রকৃত নৈকট্য লাভ করতে পারবো।
ইবাদতের ফলে অর্জিত হয় 'ইয়াকীন'। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে সুরা হিজর্ -এর ৯৯ নম্বর আয়াতে তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করো ফলে তিনি তোমাকে ইয়াক্বীন দান করবেন। আর এই ইয়াক্বীন অর্জিত হলে বান্দা আসমান এবং জমীনের 'মালাকুত' দর্শন করতে সক্ষম হবে। মহান আল্লাহ পবিত্র সুরা তাকাসুরে এপ্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
মানব সৃষ্টি দর্শন
পবিত্র সুরা যারিয়াতের ৫৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন ঃ একমাত্র আমার বান্দেগী করার জন্যই আমি জ্বীন ও মানবকে সৃষ্টি করেছি। আসলে কি মহান আল্লাহ আমাদের ইবাদতের মুখাপেক্ষী ? আর আমরাই বা কি লক্ষ্যে ইবাদত করবো ? এ গুলো প্রতিটি মানুষের মৌলিক প্রশ্ন । এপ্রশ্নগুলোর উপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে প্রতিটি ব্যক্তির ভবিষ্যত জীবন অবকাঠামো। তাই সহজে এপ্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।
অসংখ্য হাদীসে খোদার মারেফাতের উপর অত্যাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বিশেষ করে স্রষ্টার মারেফাত বা খোদা পরিচিতি লাভের ক্ষেত্রে। ইসলামী চিন্তাচেতনায় এই পরিচিতি লাভের জন্য চিন্তাভাবনাকে ইবাদতের চেয়েও অধিক মুল্যবান বলে আখ্যা দেয়া হয়েছে। এমন কি এক ঘন্টা চিন্তা করাকে এক বছর ইবাদতের সমান হিসাবে তুলনা করা হয়েছে। ইমাম রেজা (আ.) বলেন ঃ বেশী বেশী নামায ও রোযা পালন করাই ইবাদত নয় বরং ইবাদত হল প্রভুর সৃষ্টি রহস্য নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা। [আল- ক্বাফী ২/৫৫/৪]
মহানবী (স.) বলেন ঃ একঘন্টা [প্রভুর সৃষ্টি রহস্য ও শক্তি নিয়ে] চিন্তা করা একবছর ইবাদত হতে উত্তম [মিযানুল হিকমাহ্ ১৬২২২ নম্বর হাদীস]
তাই সকল ইবাদতের শ্রেষ্ঠ ইবাদত হল স্রষ্টা পরিচিতি। কেননা যাকে চিনি না তার নৈকট্য লাভ বা বৈশিষ্ট্য সমূহ অর্জন করাও আমাদের জন্য সম্ভব নয়। আর এজন্য স্রষ্টাতত্ত্বকে ইসলামী দর্শনশস্ত্রে বা আধ্যাত্মিক শাস্ত্রে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
আল্লামা ফেইজে কাশানী আপন গ্রন্থ 'কালিমাতুল মাকনুয়া মিন উলুমে আহলুল হিকমাতে ওয়াল মা'রিফাহ্'-এর ৩৩ নম্বর পৃষ্ঠায় [ আযিযুল্লাহ্ আত্তারদী কুচানীর সম্পাদনা ] নিম্নের প্রশিদ্ধ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
মহান আল্লাহ বলেন ঃ 'আমি এক গোপন রহস্যপুরী ছিলাম অতপর ইচ্ছা করলাম পরিচিত হতে তারপর অস্তিত্বের সূচনা করলাম যাতে পরিচিত হতে পারি।'
উক্ত হাদীসটিতে মহান আল্লাহ সৃষ্টিজগত সূচনার লক্ষ্য সম্পর্কে বলেন, তিনি তার সৃষ্টির মাধ্যমে পরিচিত হতে চান। তাই মহান আল্লাহর পরিচিতি লাভই সৃষ্টির মুর্খ লক্ষ্য আর এটাই হল মহান ইবাদত। সৃষ্টিজগত ও স্রষ্টা সম্পর্কে যথাযথ ধারণা পোষণ মানুষকে প্রকৃত বান্দায় পরিণত করে দেয়।
অস্তিত্ব জগতের সমস্ত কল্যাণের [কামালের] একমাত্র উৎস হল আল্লাহ্ তা'য়ালা। তাই মহান প্রভুই সৃষ্টির সকল কল্যাণমুখী যাত্রা বা কামাল অর্জনের একমাত্র মাধ্যম। আর এজন্য পবিত্র কুরআনে অসংখ্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন : সমস্তকিছুর প্রত্যাবর্তন আল্লাহর দিকেই। কেননা সমগ্র সৃষ্টিজগত পূর্ণত্বের দিকে ধাবমান। তবে কেউ কেউ সীরাতে মুস্তাক্বীমের উপর ধাবমান আর কেউ কেউ মাগদুব (গজবপ্রাপ্ত) বা দলি্লনের (পথভ্রষ্ট) পথে যাত্রা করছেন। অর্থাৎ মহান সৃষ্টা চেয়েছেন তার অনুগ্রহ সর্বব্যাপী হোক এবং সকলে এপথেই যাত্রা করুক। তাই এজন্য সৃষ্টির সূচনা করেছেন। কেননা তাঁর পরিচিতি বা মারেফাত অনুধাবনই তাদের ইনসানে কামেল-এ পৌছানোর চাবিকাঠি।
মহান আল্লাহ বলেন : 'ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহির রাজিউন' স্রষ্টার রং নিয়েই সকল অস্তিত্ব সৃষ্টিজগতে পদার্পন করেছে। আবার পরিশেষে তার দিকেই সকলকে ফিরে যেতে হবে। একবার অবতরনমুখী যাত্রায় মানুষ পৃথিবীতে অবস্থা নিয়েছে আরেকবার আরোহণমুখী যাত্রায় সে প্রভুর সানি্নধ্যে উপস্থিত হবে। অবতরনমুখী যাত্রায় তার স্বইচ্ছা ছিল নিষ্ক্রিয় তবে আরোহণমুখী যাত্রার সকল উপকরণ তাকে দেয়া হয়েছে বিধায় আপন ইচ্ছার ভিত্তিতে তাকে যেতে হবে। তাই এ যাত্রার পথ ও পাথেয় হল খোদাপরিচিতি। আর এই প্রকৃত খোদাপরিচিতিই তাকে মাকামে মাহমুদ-এ পৌছে দিবে। আমাদের সমাজে মারেফাত কথাটির ব্যাপক প্রচলন রয়েছে । তবে এর অর্থকে দারুনভাবে অপব্যাখ্যা করা হয়েছে। ফলে আমরা এক বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে ডুবে আছি।
আসলে আমরা প্রতিটি ইবাদতের প্রথমে যে নিয়াত করে বলি কুরবাতান ইলাল্লাহ্ অর্থাৎ আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য করছি। কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখেছি যে এই নৈকট্যটা কি নৈকট্য; দৈহিক নৈকট্য ? মনের নৈকট্য? স্রষ্টার হুকুম পালনের নৈকট্য ? আবার হয়ত আমরা অনেকেই এই বিষয় নিয়ে চিন্তা করার সময়ও পাই না।
যখন জনৈক শিক্ষক একজন ছাত্রকে বলবেন যে তোমার নিকটের ছেলেকে একটু ডেকে দাও। সে সাথে সাথে তার পাশের ছেলেকে ডেকে দেবে। এটা তার বস্তুগত নৈকট্যতা। আর যখন একজন শিক্ষক বলবেন এই সংখ্যাগুলোর মধ্যে [২.৮.৫.০.৯] ৯-এর নিকটতম সংখ্যা কোনটি? তখন ঐ ছাত্ররা কিন্তু পূর্বের মতো আর পাশের সংখ্যা খোঁজ করবে না। বরং তারা মান যাচাই করে দেখবে। তারা এখন আর অবস্থানগত নৈকট্যতা দেখবে না। ইসলামী দর্শনে গনিতকে বলা হয় মধ্যম দর্শন কারণ গনিতের প্রকাশিত রূপ বস্তুগত হলেও তার বিষয়বস্তুর বস্তুগত কোন রূপ নেই। তাই গনিতের একাংশ বস্তুগত বিষয় আরেকাংশ অবস্তুগত।
যাহোক ঐ সংখ্যার ক্ষেত্রে তার অবস্তুগত মান যাচাই করতে হবে। ঠিক একইভাবে যদি আমরা কোন রংয়ের কথা কল্পনা করি সেক্ষেত্রেও ঐরকম ঘটনাই ঘটবে।
০ কোন সংখ্যা নয় তাই তার কোন মানও নেই। আছে কি? এখন যদি এই ০-কে বলা হয় তুমি ৯-এর নিকটবর্তী হও। তাহলে তার কি কি কাজ করা প্রয়োজন পড়বে ?
তার প্রথম কাজ হল তাকে সংখ্যায় রূপ লাভ করতে হবে। অতএব তাকে অন্ততপক্ষে সর্বনিম্ন মান এক লাভ করতে হবে। তারপরে সে ক্রমপর্যায়ে ৯-এর মান লাভ করতে সক্ষম হবে।
সৃষ্টিজগতে যাকিছু আছে সবই ০ [সৃষ্টিজগত কিভাবে শূন্য? এর আলাদা আধ্যাত্মিক আলোচনা রয়েছে আপাতত সেদিকে যেতে চাচ্ছি না] তাই তারা কেউ কখনো ৯-এর মান অর্জনের যাত্রায় অংশ গ্রহণ করতে পারে না। একইভাবে সৃষ্টিজগতে যাকিছু রয়েছে স্রষ্টার সম্মুখে তাদের মান হল ০। এই ০ থেকে বের হওয়ার কোন পথ কারো নেই। একমাত্র মানুষ [ও জ্বীন] স্রষ্টার অনুমতিক্রমে এই ০ থেকে বের হয়ে আসার অনুমতি পেয়েছে। আর এই অনুমতির উপর ভিত্তি করে সে স্রষ্টার সকল গুন অর্জন করতে সক্ষম। এই গুণাবলীসমূহের নৈকট্য লাভের বা তা অর্জনের জন্য আমরা আজীবন নিয়াত [সাধনা] করে আসছি। কিন্তু এই হতভাগা একবারও আপন জীবনে ঐ গুণার্জনের চেষ্টা করেনি এবং ঐশী গুণলাভের কথাও ভাবেনি। সে নৈকট্য লাভের পদ্ধতিও জানতে চেষ্টা করেনি। তাই কলুর বলদের মত মানব জাতির অনেকেই ঐ ০ অবস্থায় আজীবন থেকে যায়; সে তার এ যাত্রায় এককদমও অগ্রসর হতে পারে না। আর এজাতিয় মানুষদেরকে পবিত্র কুরআন নিকৃষ্টতম পশুর সাথে তুলনা করেছে। [ সুরা আনফালের ২২ নম্বর আয়াতে]
আত্ম ও লক্ষ্য পরিচিতির অভাবই হল এর মুলত কারণ । সে যদি জানতো যে এই সৃষ্টি 'মাকামে মাহমুদ' লাভ করার উপযোগী করে তৈরী করা হয়েছে এবং তাকে অবশ্য প্রভুর দিকে প্রত্যাবর্তন করতেই হবে।
ঐ ০ হল আমাদের পাশবিক স্তর। পশু কখনো এ[অবস্তুগত] পথ পাড়ী দিতে পারে না। এপথ পাড়ী দেয়ার উপযোগী করে মহান আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। তাই খোদা পরিচিতি মানে আত্মোন্নয়নের পথ পরিচিতি; খোদা পরিচিতি মানে পাথেয় পরিচিতি; খোদা পরিচিতি মানে পথিক পরিচিতি। এই খোদা পরিচিতির মধ্যে সবকিছুই লুকিয়ে আছে।
সুরা যারিয়াতের ৫৬ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় 'আমি জ্বীন ও মানবকে একমাত্র আমার বান্দেগী করার জন্যই সৃষ্টি করেছি। ইমাম জাফর সাদিক বলেন যে, ইমাম হুসাইন (আ.) বলেছেন ঃ মহান আল্লাহ তার বান্দাদেরকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁর পরিচিতি (মারেফাত) লাভের জন্য। তাই যখন সে পরিচিতি লাভ করবে সাথে সাথে তাঁর ইবাদতও করবে। আর যখনই তার বান্দেগী করবে তখন অন্যের দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভ করবে। [এই হাদীসটি তাফসিরে আল-মিযান এবং তাফসিরে নামুনা উভয়ই উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন]
এখন প্রশ্ন হল আসলে এই মারেফাত কি ? এবং কিভাবে লাভ করা যায়?
মারেফাত হল প্রতিটি জিনিসের আসল রূপ দর্শন করা। কোন আড়াল বা আচ্ছাদন মুক্ত অবস্থায় কাংঙ্খিত বিষয় দর্শন লাভ করা। এরূপ দর্শন লাভের জন্য সকলপ্রকারে উপকরণ মহান স্রষ্টা মানুষকে দিয়েছেন। কিন্তু মানুষ তার পাশবিক বৈশিষ্ট্য সমূহের বশভুত হয়ে ঐ উপকরণ গুলোকে অকেজো করে দেয়। ফলে সে মানুষের যাত্রা পথ থেকে বিচু্যত হয়ে পশুদের পালে যেয়ে চরতে থাকে।
তাই মারেফাত হল বিশেষ জ্ঞান যা অর্জনের একমাত্র পথ হল 'তাকওয়া'। পবিত্র কুরআন যেহেতু পথ, পাথেয় ও পথিক পরিচিতর উৎস তাই এখানে সকল বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া আছে। মহান আল্লাহ বলেন ঃ তোমারা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর আল্লাহ তোমাদের [জ্ঞান] শিক্ষা দান করবেন। [সুরা বাকারা ২৮২ নম্বর আয়াত]
হে আল্লাহর পথের যাত্রীগণ তোমরা পথের গাইড ম্যাপ চাও পথের পরিচিতি লাভ করতে চাও ? তাহলে আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর, তিনিই সে জ্ঞান তোমাদের দান করবেন ; এ অঙ্গীকার তিনি নিজেই করেছেন। পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট ভাবে বলা হয়েছে যে, মানুষ এ পৃথিবীতে একজন যাত্রী তার এ যাত্রা পথের চুড়ান্ত পর্যায় অবস্থান করছে প্রভুর সাক্ষাত। 'হে মানুষ , তোমাকে তোমার পালনকর্তা পর্যন্ত পৌছাতে কষ্ট ও প্রচেষ্টা করতে হবে, অতপর তার সাক্ষাত লাভ করবে'। [ সুরা ইনশিকাক৬ নম্বর আয়াত]
নিঃসন্দেহে অসংখ্য মানুষ তাদের জীবনের কোন কোন মুহুর্তে আল্লাহর পথে যাত্রার আত্মিক অনুপ্রেরণা লাভ করে থাকে কিন্তু এই অনুপ্রেরণাকে অনুসরণ করে আত্মিক উন্নতির কোন পথে চলবে সে দিশা পায় না। সত্যমিথ্যা ঠিক-বেঠিক নির্ণয় করতে সক্ষম হন না। ফলে হয়তবা তারা তাদের সে অনুপ্রেরণা হারিয়ে ফেলেন নতুবা ভ্রান্ত পথে যাত্রা শুরু করেন। অনেক সময় পথ চলতে চলতে দ্বিধাদ্বন্দ্বের জালে নিপতিত হয়ে পড়েন। এশ্রেণীর পথিকদেরকে দ্বিধা ও সংশয় দুর করার শক্তিও মহান প্রভু এই তাকওয়ার মধ্যে সন্নেবেশিত করে দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন ঃ হে ঈমানদারগণ তোমরা যদি তাকওয়া অবলম্বন কর তাহলে আল্লাহ তোমাদের দান করবেন সবকিছুর বাস্তবরূপ দর্শনের শক্তি। [সুরা আনফাল ২৯ নম্বর আয়াত]
'ফুরকান' দান করবেন। 'ফুরকান' হল আসল ও নকল পৃথক করার কষ্টিপাথর যা দিয়ে সে তার পথকে সহজে বেছে নিতে পারবে। তখন সে এপথে চলতে সাচ্ছান্দবোধ করবে।
যে কোন দুরের যাত্রায় অবশ্যই এ যাত্রা পথের উপযোগী পাথেয় সাথে নেয়া দরকার হয়। আবার এমন অনেক পাথেয় থাকে যা পথিমধ্যে শেষ হয়ে যায়। ফলে যাত্রীরা তাদের অভিষ্ট লক্ষ্যে উপনীত হতে পারে না। তাই এ পথের সর্বোত্তম পাথেয়োর পরিচয়ও দিয়েছেন স্বয়ং মহান আল্লাহর রব্বুল আলামীন। তিনি বলেন ঃ আর তোমরা পাথেয় সাথে নিয়ে নাও। নি:সন্দেহে সর্বোত্তম পাথেয় হচ্ছে তাকওয়া [সুরা বাকারা ১৯৭ নম্বর আয়াত।]
দুনিয়ার মানুষেরা বোঝে না যে তার প্রকৃত পাথেয় কি ? তারা তাদের জীবনের বিনিময়ে এমন কিছু সংগ্রহ করে যা তারা তাদের এ যাত্রা পথের একপর্যায় গিয়ে আর সাথে করে নিয়ে যেতে পারে না। আর এজন্য মহান স্রষ্টা অর্থ-সম্পদ ও স্ত্রী-পুত্র সম্পর্কে মানুষকে সাবধান করে দিয়েছেন। কেননা এগুলো তোমরা তোমাদের পাথেয় হিসাবে কাজে লাগাতে পারবে না। বরং তাদের দ্বারা তোমার অতিকষ্টে অর্জিত পাথেয় লুণ্ঠিত হতে পারে। তাই এপথে চলার সর্বোত্তম পাথেয় হল তাকওয়া। যা সর্বাবস্থায় তার সাথেই থাকবে এবং সে তার মালিককে একাকী ছেড়ে দেবে না।
আবার অনেক সময় মানুষ এপথ চলার কোন এক স্থানে যেয়ে আটঁঁকা পড়ে যেতে পারে। হঠাৎ কোন গর্তে পড়ে যেতে পারে অথবা শত্রু দ্বারা আক্রান্তও হতে পারেন। তাই তার এই যাত্রা পথের কন্টকচক্র থেকে মুক্তির জন্য একটি বিশেষ মাধ্যম্যের প্রয়োজন। যাদ্বারা সে তার দুঃসময়ে মুক্তি লাভ করে পথ চলা অব্যাহত রাখতে পারে। সেই দুঃসময়ে মুক্তির মাধ্যম্যের পরিচয়ও মহান প্রভুর পবিত্র কুরআনে দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন ঃ আর যে আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে আল্লাহ তার জন্যে মুক্তির পথ দান করেন এবং তাকে এমন পরিমাণ জীবিকা দান করেন যা সে কখনো কল্পনা করেনি। [সুরা তালাক ২ নম্বর আয়াত]
তাকওয়াহীন মানুষদের অবস্থা
আমি তাদের গর্দানের চিবুক পর্যন্ত বেড়ী পরিয়ে দিয়েছি। ফলে তাদের মস্তক উর্দ্ধমুখী হয়েগেছে। আমি তাদের সামনে ও পিছনে প্রাচীর স্থাপন করেছি, অত:পর তাদেরকে আবৃত করে দিয়েছে। ফলে তারা দেখে না। [ সুরা ইয়াসীন ৮/৯ নম্বর আয়াত।]
[ইসলামী বিডি]

latest article

  ইমাম যায়নুল আবেদীন (আ.)-এর শাহাদাত ...
  কারবালা বিপ্লবের সংরক্ষক হযরত ইমাম ...
  ইয়াযীদের দরবারে ইমাম সাজ্জাদ (আ.)
  আহলে বায়তের উজ্জ্বল নক্ষত্র হযরত ...
  ইমাম হোসাইন (আ.)'র চেহলাম
  ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কতিপয় খুতবা ও বাণী
  আল্লাহর ওলীদের জন্য শোক পালনের দর্শন
  ‘ইমাম হুসাইন (আ.)’র বিপ্লবই ইসলামকে ...
  যুগের ইমাম সংক্রান্ত হাদীসের ওপর ...
  হজ্জ্ব : ইসলামী ঐক্যের প্রতীক

user comment

بازدید ترین مطالب سال

انتخاب کوفه به عنوان مقر حکومت امام علی (ع)

حکایت خدمت به پدر و مادر

داستانى عجيب از برزخ مردگان‏

فلسفه نماز چیست و ما چرا نماز می خوانیم؟ (پاسخ ...

رضايت و خشنودي خدا در چیست و چگونه خداوند از ...

چگونه بفهميم كه خداوند ما را دوست دارد و از ...

سخنراني مهم استاد انصاريان در روز شهادت حضرت ...

در کانال تلگرام مطالب ناب استاد انصاریان عضو ...

مرگ و عالم آخرت

نرم افزار اندروید پایگاه اطلاع رسانی استاد ...

پر بازدید ترین مطالب ماه

سِرِّ نديدن مرده خود در خواب‏

ذکری برای رهایی از سختی ها و بلاها

آیه وفا (میلاد حضرت عباس علیه السلام)

سرانجام كسي كه نماز نخواند چه مي شود و مجازات ...

رمز موفقيت ابن ‏سينا

تنها گناه نابخشودنی

اهمیت ذکر صلوات در ماه شعبان

اهمیت و ارزش و فضیلت های ماه شعبان

رفع گرفتاری با توسل به امام رضا (ع)

بهترین دعاها برای قنوتِ نماز

پر بازدید ترین مطالب روز

با این کلید، ثروتمند شوید!!

آیا حوریان و لذت های بهشتی فقط برای مردان است؟

روش امام زین العابدین(ع) در تربیت روحی

چند روايت عجيب در مورد پدر و مادر

چگونه بفهیم عاقبت به خیر می‌شویم یا نه؟

طلبه ای که به لوستر های حرم امیر المومنین ...

عشق امام سجاد (ع) به عبادت

آيا فكر گناه كردن هم گناه محسوب مي گردد، عواقب ...

تقيه چيست و انجام آن در چه مواردي لازم است؟

فرق كلّي حيوان با انسان در چیست ؟