বাঙ্গালী
Sunday 19th of May 2019
  818
  0
  0

আব্বাসীয় শাসক মুতাসিমের ষড়যন্ত্রে শহীদ হন ইমাম জাওয়াদ আ

হিজরি জিলক্বাদ মাসের শেষ দিন নবীজীর আহলে বাইতের ইমাম হযরত জাওয়াদ (আ) এর শাহাদাতবার্ষিকী। ২২০ হিজরির এই দিনে ইমাম জাওয়াদ (আ) খোদার দিদারে চলে যান আর সমগ্র মুসলিম বিশ্ব ইমামকে হারানোর ব্যথায় শোকাভিভূত হয়ে পড়ে। নবীজীকে রেসালাতের যে মহান দায়িত্ব দিয়ে আল্লাহ পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন, নবীজীর অবর্তমানে সেই মহান দায়িত্ব পালনের ধারাবাহিকতায় তাঁর আহলে বাইত ব্যাপক চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালান। নবীজীর চিন্তার সেই গভীর জ্ঞানের আলো দিয়ে তাঁরা মুসলিম উম্মাহর সামাজিক-সাংস্কৃতিক চিন্তা-চেতনায়ও ব্যাপক প্রভাব ফেলেন। আমরা যদি একবার নবীজীর আহলে বাইতের জীবনেতিহাস পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখতে পাবো ইসলামের মৌলিক ভিত্তিকে সংরক্ষণ করার ক্ষেত্রে তাঁরা মূল্যবান অবদান রেখে গেছেন।

 

তাঁরা সবসময় কায়েমি স্বার্থবাদীদের জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন যাতে ইসলামের মহান স্বরূপ সর্বদা অটুট থাকে। ইমাম জাওয়াদ (আ) নবীজীর আহলে বাইতের একজন ইমাম যিনি তাঁর ১৭ বছরের ইমামতিকালে সবসময় ইসলামের প্রচার-প্রসারে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। মহান এই ইমামের বেদনাঘন শাহাদাতবার্ষিকীতে তাই আপনাদের জানাচ্ছি আন্তরিক শোক ও সমবেদনা। তাঁর জীবন থেকে খানিকটা আলোচনা করে আমরা সমৃদ্ধ করবো আমাদের জীবন।

 

ইমাম জাওয়াদ (আ) তাঁর এক বক্তৃতায় বলেছেন,'মানুষ যদি তিনটি বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে পারে তাহলে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে পারে। একটি হলো-আল্লাহর কাছে বেশি বেশি ক্ষমা প্রার্থনা করা। দুই,মানুষের সাথে নম্র আচরণ করা এবং তিন,বেশি বেশি দান-সদকা করা।' ইমাম জাওয়াদ (আ) মানুষের সেবা করাকে আল্লাহর রহমত অবতীর্ণ হবার কারণ বলে মনে করেন। এ ব্যাপারে কেউ যদি কৃপণতা করে তাহলে তাহলে আল্লাহর নিয়ামত থেকে বঞ্চিত হবার সম্ভাবনা থাকে। এ ব্যাপারে তিনি বলেন: আল্লাহর নিয়ামত যখন কারো ওপর নাযিল হয়, তার কাছে মানুষের প্রয়োজনীয়তাও বেড়ে যায়। মানুষের এই প্রয়োজনীয়তা মেটানোর চেষ্টা যে না করে,সে নিজেকে আল্লাহর নিয়ামত হারানোর আশঙ্কার মুখে ঠেলে দেয়।

 

ইমাম জাওয়াদ (আ) ইমাম রেযা (আ) এর সন্তান ছিলেন। ১৯৫ হিজরিতে তিনি মদিনা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্রায় ২৫ বছর জীবনযাপন করেন। এই স্বল্পকালীন জীবনে তিনি মানুষের চিন্তা-চেতনার বিকাশ ও উন্নয়নে প্রভাবশালী ভূমিকা রাখেন। ইমাম জাওয়াদ (আ) মাত্র আট বছর বয়সে ইমামতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এতো অল্প বয়সে তাঁর ইমামতিত্বের বিষয়টি ছিল যথেষ্ট বিস্ময়কর ও সন্দেহজনক। এই সন্দেহের কারণ হলো বহু মানুষ বিশ্বের বিভিন্ন বিষয়কে কেবল তার বাহ্যিক এবং বস্তুগত মানদণ্ডেই বিচার-বিবেচনা করে থাকে। অথচ আল্লাহর তো এই শক্তি আছে যে তিনি মানুষকে তার বয়সের স্বল্পতা সত্ত্বেও পরিপূর্ণ বিবেক-বুদ্ধির পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেন। কোরানের আয়াতের ভিত্তিতে পূর্ববর্তী উম্মতের মধ্যেও এরকম উদাহরণ বহু আছে। যেমন শিশুকালে হযরত ইয়াহিয়া (আ) এর নবুয়্যত প্রাপ্তি, মায়ের কোলে নবজাতক ঈসা (আ) এর কথা বলা ইত্যাদি আল্লাহর সর্বশক্তিমান ক্ষমতারই নিদর্শন।

 

ইমাম জাওয়াদ (আ) শৈশব-কৈশোরেই ছিলেন জ্ঞানে-গুণে, ধৈর্য ও সহনশীলতায়, ইবাদত-বন্দেগিতে, সচেতনতায়, কথাবার্তায় বিস্ময়কর উন্নত পর্যায়ের। ইতিহাসে এসেছে একবার হজ্জ্বের সময় বাগদাদ এবং অন্যান্য শহরের বিখ্যাত ফকীহদের মধ্য থেকে আশি জন মদিনায় ইমাম জাওয়াদ (আ) এর কাছে গিয়েছিলেন। তাঁরা ইমামকে বহু বিষয়ে জিজ্ঞেস করে অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত ও সন্তোষজনক জবাব পেলেন। এরকম জবাব পাবার ফলে জাওয়াদ (আ) এর ইমামতিত্বের ব্যাপারে তাদের মনে যেসব সন্দেহ ছিল-তা দূর হয়ে গেল। ইমাম জাওয়াদ (আ) বড়ো বড়ো পণ্ডিতদের সাথে এমন এমন তর্ক-বাহাসে অংশ নিতেন যা কিনা ছিল রীতিমতো বিস্ময়কর। এসব বিতর্কে তাঁর জ্ঞানের গভীরতার বিষয়টি প্রমাণিত হয়ে যেত। কেবল তাই নয় তাঁর দেওয়া যুক্তির ফলে জ্ঞানের বহু জটিল বিষয়ও সহজ হয়ে যেত।

 

এ কারণে জ্ঞানীজনেরা এমনকি তাঁর বিরোধীরাও তাঁর জ্ঞানের গভীরতার বিষয়টি এবং তাঁর উন্নত আধ্যাত্মিক সত্ত্বার বিষয়টি অস্বীকার করতেন না। একদিন আব্বাসীয় খলিফা মামুন ইমাম জাওয়াদ (আ) এর জ্ঞানের গভীরতা পরীক্ষা করার জন্যে একটি মজলিসের আয়োজন করে। সেখানে তৎকালীন জ্ঞানী-গুণীজনদেরকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ঐ মজলিসে তৎকালীন নামকরা পণ্ডিত ইয়াহিয়া ইবনে আকসাম ইমামকে একটি প্রশ্ন করেন। প্রশ্নটি ছিল এই: যে ব্যক্তি হজ্জ্ব পালনের জন্যে এহরাম বেঁধেছে,সে যদি কোনো প্রাণী শিকার করে,তাহলে এর কী বিধান হবে? ইমাম জাওয়াদ (আ) এই প্রশ্নটিকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে মূল প্রশ্নের সাথে সংশ্লিষ্ট ২২টি দিক তুলে ধরে উত্তরের উপসংহার টানেন। উত্তর দেওয়ার এরকম স্টাইল ছিল তাঁর জ্ঞানের বিস্ময়কর গভীরতার নিদর্শন। উত্তর পেয়ে উপস্থিত জ্ঞানীজনেরা ইমামের জ্ঞানের বিষয়টি কেবল স্বীকারই করলেন না বরং তাঁর জ্ঞানের প্রশংসাও করলেন।

 

২০৩ হিজরি থেকে ২২০ হিজরি পর্যন্ত মোট সতেরো বছরের ইমামতিকালে শাসক ছিলেন দুইজন আব্বাসীয় খলিফা। একজন হলেন মামুন আরেকজন মু'তাসিম। এরা আল্লাহর বিধি-নিষেধগুলোকে তেমন একটা মানতেন না এবং অনেক সময় ইসলামকে নিজেদের স্বার্থানুকূলে ব্যবহার করতেন। ইমাম জাওয়াদ (আ) এসব দেখে চুপ করে থাকতে পারলেন না।তিনি সেসবের বিরোধিতা করলেন। সমাজে তাঁর এই বিরোধিতার ব্যাপক প্রভাব পড়ে। এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় আব্বাসীয় খলিফারা ইমামকে হয়রানীর মাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে অবরোধ কঠোরতরো করে। ইমাম মামুনের পীড়াপীড়িতে মদিনা ছেড়ে আব্বাসীয় খিলাফতের তৎকালীন মূল কেন্দ্র বাগদাদে যেতে বাধ্য হন। তা সত্ত্বেও ইমাম জনগণের সাথে বিভিন্ন কৌশলে যোগাযোগ রক্ষা করে তাঁর সংগ্রাম অব্যাহত রাখেন। মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তো বটেই এমনকি স্বয়ং আব্বাসীয়দের হুকুমতের ভেতরেই আহলে বাইতের প্রতি বহু ভক্ত অনুরক্ত ছিল। ইমাম তাদেরকে অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা করার জন্যে অনেক অবদান রেখেছিলেন।

 

জাওয়াদ শব্দের অর্থ হলো দয়ালু বা উদার। এই উপাধিটি থেকেই প্রমাণিত হয় যে ইমাম জাওয়াদ ছিলেন অসম্ভব উদার বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তাঁর আসল নাম ছিল মুহাম্মাদ তাকি। তাঁর পিতা ইমাম রেযা (আ) জনগণের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করার স্বার্থে যেসব উপদেশ দিয়েছিলেন,সেসবের মধ্যে একটি ছিল নিজের কাছে কিছু টাকা-পয়সা রাখা যাতে মানুষের প্রয়োজনে দান করতে পারেন। বাবার এই উপদেশ পালন করতে গিয়েই তিনি জাওয়াদ উপাধিতে ভূষিত হন। একবার একটি কাফেলা অনেক দূর থেকে ইমামের জন্যে বহু উপহার নিয়ে আসছিলো। পথিমধ্যে সেগুলো চুরি হয়ে গেল। কাফেলার পক্ষ থেকে ঘটনাটা ইমামকে লিখে জানানো হলো। ইমাম উত্তরে লিখলেন: আমাদের জান এবং মাল আল্লাহর দেওয়া আমানত। এসব থেকে যদি উপকৃত হওয়া যায় তো ভালো, আর যদি এগুলো হারিয়ে যায় তাহলে আমাদের ধৈর্য ধারণ করা উচিত।কেননা তাতে সওয়াব রয়েছে। সঙ্কটে যে ভেঙ্গে পড়ে তার প্রতিফল বিফলে যায়।

 

ইমামের জীবনের শেষ দু'বছরে আব্বাসীয় শাসক ছিলো মুতাসিম। মুতাসিম জনগণের মাঝে ইমামের জনপ্রিয়তায় উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ইমামের বক্তব্যে জনগণের মাঝে এক ধরনের জাগরণ সৃষ্টি হয়। যার ফলে মুতাসিমের ভেতর ঈর্ষার আগুণ জ্বলতে থাকে। তাই ইমামের বিরুদ্ধে শুরু করে বিচিত্র ষড়যন্ত্র। এই ষড়যন্ত্রের ফলেই মাত্র ২৫ বছর বয়সে ইমাম শাহাদাতবরণ করেন। তাঁর শাহাদাতবার্ষিকীতে তাই আবারো আপনাদের প্রতি রইলো আন্তরিক সমবেদনা। ইমামের একটি বাণী উচ্চারণ করে শেষ করবো আজকের আলোচনা।

 

"বাজে লোকের বন্ধুত্ব থেকে দূরে থাকো, কেননা তার বন্ধুত্ব হলো তলোয়ারের মতো, যার বাহ্যিক দিকটা বেশ চকচকে আর কাজটি খুবই জঘন্য।"

 

  818
  0
  0
امتیاز شما به این مطلب ؟

latest article

      ওয়াহাবিরা ইসলামী নির্দশনগুলো ধ্বংস ...
      মহানবী (স.), আহলে বাইত (আ.) ও সাহাবীদের ...
      হযরত ফাতেমার প্রতি নবী (সা.)-এর মহব্বত ...
      সাইয়্যেদুন্নিসা খাতুনে জান্নাত ...
      মহানবী’র (সা.) জন্মস্থান ধ্বংস করে ...
      তাকওয়া অর্জনের উত্তম মৌসুম
      ধর্ম বিশ্বাস প্রশান্তির প্রধান উৎস
      ইসলামের দৃষ্টিতে কর্ম ও শ্রম (১ম পর্ব)
      নবীবংশের এগারতম নক্ষত্র ইমাম হাসান ...
      নবীবংশের এগারতম নক্ষত্র ইমাম আসকারী ...

 
user comment