বাঙ্গালী
Wednesday 16th of October 2019
  5951
  0
  0

ইসলামের পবিত্র চারটি মাস ও আমাদের করণীয়

উত্তরানিউজ ডেস্ক : ইসলাম চির শাশ্বত। এর বিধানও চির শাশ্বত। এই পৃথিবী, আকাশ, নদী সাগর, বন-বাদাড়, পাহাড়-পর্বত, চন্দ্র-সূর্য তারকা এ সবই সৃষ্টি একমাত্র আল্লাহর। আর এসব কিছু চলে একটি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে। যা স্বয়ং বিধাতার বিধান।
মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর হুকুমে যেমন সৃষ্ট এ বিশ্বলয়, তেমনি তাঁরই বেঁধে দেওয়া নিয়মেই সব কিছু চলে। যেমন আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, "লোকেরা আপনাকে নতুন চাঁদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি তাদের বলে দিন এটা মানুষের (বিভিন্ন কাজকর্মের) এবং হজের সময় নির্ধারণ করার জন্য। (সুরা বাকারা : ১৮৯) অন্যত্র ইরশাদ করেন "সূর্য ও চন্দ্র একটি হিসাবের মধ্যে আবদ্ধ আছে।" (সুরা রহমান : ৫) আরো ইরশাদ করেন, ‘এবং যাতে তোমরা বছর-সংখ্যা (মাসের) হিসাব জানতে পার। আমি সব কিছু পৃথক পৃথকভাবে স্পষ্ট করে দিয়েছি।' (সুরা বনি ইসরাইল : ১২)
আমরা মাস বলে যার সঙ্গে পরিচিত, আরবিতে এটিকে শাহর বলা হয়। যেমন শাহরি রমজান বললে আমরা সবাই বুঝি রমজান মাস। যাহোক শাহরু শব্দের বহুবচন হলো আশহুরুন। পবিত্র কোরআনে ‘আশহুরুল হুরুম' ও ‘আশহুরুল হজ' বলে আয়াত নাজিল হয়েছে। তাই আজ আশহুরুল হুরুম ও আশহুরুল হজ কী, তা জানার চেষ্টা করব।
আশহুরে হুরুমের মাহাত্ম্য
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, "প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা ১২টি, যা আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী সেই দিন থেকে চালু আছে যে দিন আল্লাহ তায়ালা আকাশমণ্ডল ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছিলেন। এর মধ্যে চারটি মাস মর্যাদাপূর্ণ। এটাই দ্বীন (এর) সহজ সরল (দাবী)। (তাওবা : ৩৬)। উল্লেখিত চারটি মাস হলো যিল কা'দ, যিল হজ, মুহাররাম ও রজব। পূর্ববর্তী নবীদের যুগেও এ চারটি মাস অতি বরকতময় ও সম্মানিত জ্ঞান করা হতো। তাদের আনীত ও প্রণীত শরিয়ত এ ব্যাপারেও একমত যে এ মাসগুলোতে সব ধরনের ইবাদতের সওয়াব বেশি এবং গুনাহের পরিণামও তুলনামূলক ভয়াবহ। এ ছাড়া এসব মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহ, কলহ-বিবাদ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ছিল। এদিকে আরবের মুশরিকরা ছিল হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর বংশধর। তাঁর সময়ও এ চারটি মাস ছিল সম্মানিত। যাতে যুদ্ধ নিষিদ্ধ ছিল। লোকেরা ছিল হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর ধর্মানুসারী। যদিও তারা মুর্তিপূজায় লিপ্ত হয়ে তাঁর ধর্মকে জঘন্যভাবে বদলে ফেলেছিল।
কিন্তু এই চার মাসের সম্মান মর্যাদা ঠিকই তারা স্বীকার করত এবং এ সময়ে যুদ্ধ-বিগ্রহ অবৈধ মনে করত। কালক্রমে এই বিধানটি তাদের জন্য কঠিন মনে হতে লাগল। কেননা যিলকদ থেকে মুহররম মাস পর্যন্ত একাধারে তিন মাস যুদ্ধ-বিগ্রহ বন্ধ রাখা তাদের স্বভাববিরোধী ছিল। এ সমস্যার সমাধান তারা মাসকে আগ পিছ করে বিন্যাস বদলের মাধ্যমে করল, যাকে ‘নাসী' বলা হয়। এর দ্বারা মাসের নাম বদল হলেও এর কুফল কিন্তু বহালতবিয়তেই ছিল। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা যে মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহকে বাস্তবিকই হারাম করেছিলেন, সে মাসে তারা তা হালাল করে নিত। আল্লাহ তায়ালা তাদের এই জঘন্য অযৌক্তিক প্রথার মূলোচ্ছেদ করেছেন সুরা তাওবার ৩৭ নম্বর আয়াতে।
হুরুম কি
আবু বকর আল জাসসাস (রহ.) বলেন, এই চারটি মাসকে ‘হুরুম' বলার কারণ দুটি- ১. এ মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহ হারাম। যা মুশরিকরাও মানত। ২. অন্য মাসের তুলনায় এ মাসে গোনাহের পরিণতি বেশি ভয়াবহ এবং এবাদতের প্রতিদান অনেক বড়। প্রথমোক্ত বিধানটি সর্বসম্মতিক্রমে রহিত হয়ে গেছে। দ্বিতীয়টি আপন অবস্থায় বহাল আছে।
আশহুরে হুরুমের বৈশিষ্ট্য
এই চারটি মাসের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে আবু বকর আল জাসসাস (রহ.) বলেন, এই মাসগুলোতে ইবাদতে অভ্যস্ত হলে অন্য মাসেও ইবাদতের প্রতি আগ্রহ অটুট থাকবে। আর এই মাসে গুনাহ ও মন্দ কাজগুলো থেকে বেঁচে থাকতে পারলে অন্য মাসেও এর থেকে বেঁচে থাকা সহজ হবে। কারণ প্রতিটি জিনিসের স্বজাতের প্রতি আকর্ষণ থাকে, ভিন্ন জাতের প্রতি বিকর্ষণ। অতএব এ মাসে বেশি ইবাদতকারী অন্য মাসেও ইবাদতের প্রতি আকৃষ্ট হবে। আর নাফরমান গুনাহের প্রতি বেশি ঝুঁকবে।
আশহুরে হুরুমের আমল
এ মাসের আমলকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। একটি হলো বর্জনীয় আমল, অন্যটি হলো করণীয় আমল।
তাই এ মাসের বর্জনীয় আমল সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন ‘অতএব তোমরা এ মাসগুলোর ব্যাপারে নিজেদের ওপর জুলুম করো না' (সুরা তাওবা : ৩৭)।
আয়াতে বলা হয়েছে ‘নিজেদের ওপর জুলুম করো না' এর তাৎপর্য হলো মক্কার মুশরিকদের মতো নাম বদলের মাধ্যমে বিন্যাসে পরিবর্তন সাধন করা। কিংবা এসব মাসের নির্দিষ্ট বিধি-বিধান ও সম্মানের প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করা এবং ইবাদতে অবহেলা করা।
যা করতে হবে
আশহুরে হুরুমে করণীয় আমল সম্পর্কে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, "যে ব্যক্তি শাহরে হারামে বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবার রোজা রাখবে, তার জন্য দুই বছর নফল ইবাদতের সওয়াব লিপিবদ্ধ করা হবে।' (আল মুজামুল আওসাত ২/২১৯)। এ ছাড়া যেকোনো ইবাদত বেশি বেশি করাও এই মাসগুলোর দাবী।
আশহুরে হজ
প্রতিটি মাসের সঙ্গেই রয়েছে দ্বীনি ও পার্থিব স্বার্থের সংশ্লিষ্টতা। ইসলামের অন্যতম ইবাদত হজের জন্যও আল্লাহ তায়ালা কয়েকটি মাস নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। ইরশাদ করেন, ‘হজের নির্দিষ্ট কয়েকটি মাস আছে' (সুরা বাকারা : ১৯৭)। যেমন এ মাসগুলো হলো- শাওয়াল, যিলক্বদ ও যিলহজের প্রথম ১০ দিন। মুফতি শফী (রহ.) বলেন, শাওয়াল থেকে হজের মাসের গণনা শুরু হয়, এর অর্থ হলো, শাওয়ালের আগে হজের ইহরাম বাঁধা জায়েজ নেই। অনেকের মতে এ ধরনের ইহরাম দ্বারা হজ আদায় করলে তা আদায়ই হবে না। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে আদায় হলেও মাকরূহ হবে।
শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতীক
আল্লাহ তায়ালা কোরআনে চারটি জিনিসকে পুরো মানবজাতির শান্তি, নিরাপত্তা ও অস্তিত্ব রক্ষার প্রতীক হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এক. বাইতুল্লাহ শরিফ, দুই. সম্মানিত চার মাস অর্থাৎ আশহুরে হুরুম। তিন. হাদী অর্থাৎ ওই পশু, যার গলায় মালা পরিয়ে হারাম শরিফে নিয়ে যাওয়া হয় কোরবানী করার জন্য। চার. কলায়েদ অর্থাৎ গলার হার। ইসলাম পূর্ব আরবের প্রথা ছিল যে ব্যক্তি হজের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করত, সে হজের নিদর্শনস্বরূপ একটি মালা গলায় পরে নিত। (যেমন আজকাল আইডেন্টি কার্ড ব্যবহৃত হয়) এটি ছিল কারো অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- ‘আল্লাহ কাবাকে যা অতি মর্যাদাপূর্ণ ঘর মানুষের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার মাধ্যম বানিয়েছেন। তাছাড়া মর্যাদাপূর্ণ মাসগুলো, হাদী এবং গলার মালাগুলোকেও (নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার মাধ্যম বানিয়েছেন)- (সুরা মায়েদা : ৯৭)।
মুফতি শফী (রহ.) বলেন, হজের মাসগুলোকেও ‘আশহুরে হুরুম' বলা হতো। (মারেফুল কোরআন ৩/২৩৯)
অতএব, হজের মাসগুলো এবং আশহুরে হুরুমে ইবাদতের প্রতি বেশি মনযোগী হওয়া। সর্বপ্রকার গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা এবং দেশ, জাতি ও বিশ্বমানবতার নিরাপত্তা ও শান্তি বজায় রাখার প্রতি সবাইকে সচেতন হতে হবে।
লেখক : পরিচালক, ফতোয়া সংকলন প্রকল্প,
মারকাযুল ফিকরিল ইসলামী বাংলাদেশ

  5951
  0
  0
امتیاز شما به این مطلب ؟
[ হারাম মাস ]     [ সম্মানিত মাস কী কী ]     [ চন্দ্র মাস কি ]     [ আরবি হারাম মাস কয়টি ও কি কি ]     [ আরবি কোন চার মাস নিষিদ্দ ]     [ আরবি মাসের হিসাব ]     [ সম্মানিত মাস সমূহ ]     [ পবিত্র মাস কয়টি ও কি কি ]     [ নিষিদ্ধ মাস ]     [ ইস্লামে নিষিদ্ধ মাস ]     [ ইসলামের যুদ্ধ সমূহ ]     [ কুরআনে কয়টি মাসকে পবিত্র করা হয়ে ]     [ আরবি হারাম মাস কি কি ও কেন ]     [ ইসলাম এর যুদ্ধ কি মাসে বেশি হয়েছে ]     [ হারাম মাস কয়টি কি কি ]     [ আরবী হারাম মাস কয়টি কি কি ]     [ নিষিদ্ধ চার মাস ]     [ আরবি কোন তিন মাসে যুদ্ধ হারাম ]     [ আরবি হারাম মাস ]     [ কুরআনে আরবি কোন মাসের নাম আছে ]     [ হারাম মাস কি কি ]     [ আরবি হারাম মাস সমূহ ]     [ আরবি কোন কোন মাসে যুদ্ধ করা হারাম ছিল ]     [ আরবি কোন চারটি মাস কে হারাম বলা হয়েছে ]     [ নিষিদ্ধ মাস কয়টি ]     [ সম্মানিত চারটি আরবী হারাম মাসের নাম। ]     [ কোরআনে আরবি মাসের নাম আছে ]     [ চন্দ্র মাস কি ]     [ আরবের যুদ্ধ নিষিদ্ধ মাস কোন দুইটি ]    

latest article

      इमाम मूसा काज़िम अलैहिस्लाम
      সিরিয় বিদ্রোহীদের অস্ত্রের ...
      শান্তির তকমা লাগিয়ে রণে রত ওবামা
      কা’বা ঘর কেন্দ্রিক ইবাদাতের বিধান কি ...
      নবী ও রাসূলের প্রয়োজনীয়তা
      প্রসঙ্গ : ‘ইলমে গ্বায়েব
      কারবালার প্রেক্ষাপট : কীভাবে নবীর (সা.) ...
      রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর ...
      গীবত
      শীয়া মাযহাবের উপদলসমূহ

 
user comment