বাঙ্গালী
Monday 22nd of July 2019
  1227
  0
  0

ইমাম হুসাইন (আ.)’র নেতৃত্বে ইসলাম পুনরুজ্জীবনের বিপ্লব’

ইমাম হুসাইন (আ.)’র নেতৃত্বে ইসলাম পুনরুজ্জীবনের বিপ্লব’

উষ্ণীষ কুরআনের, হাতে তেগ আরবীর

দুনিয়াতে নত নয়, মুসলিম কারো শির,-

তবে শোন ঐ শোন বাজে কোথা দামামা!

শমসের হাতে নাও, বাঁধো শিরে আমামা!

বেজেছে নাকাড়া হাঁকে নকীবের তুর্য

হুঁশিয়ার ইসলাম ডুবে তব সূর্য!

জাগো, ওঠো মুসলিম, হাঁকো হায়দরী হাঁক

শহীদের খুনে সব লালে লাল হয়ে যাক!

পৃথিবীতে যা যত বেশি দামী বা গুরুত্বপূর্ণ তা অর্জনের জন্যও তত বেশি শ্রম বা মূল্য দিতে হয়। একত্ববাদ, স্বাধীনতা, মানবতা ও উচ্চতর সব মূল্যবোধেরই সমষ্টি হল ইসলাম। তাই ইসলাম মানবজাতির জন্য মহান আল্লাহর সবচেয়ে বড় উপহার। এই ইসলাম মানবজাতির কাছে এসেছে হাজার হাজার বছর ধরে এক লাখ বা দুই লাখ নবী বা খোদায়ী প্রেরিত পুরুষের অশেষ ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং রক্তের বিনিময়ে। পরিপূর্ণ বা পূর্ণাঙ্গ ধর্ম ইসলামের মহাতরীর অগ্রযাত্রা বিশ্বনবী (সা.)র মাধ্যমে অতীতের ইতিহাসের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে।  কিন্তু বিশ্বনবী (সা.)র তিরোধানের পর এই মহাতরীর অগ্রযাত্রা ধীরে ধীরে স্তিমিত হতে থাকে। এ প্রসঙ্গে খিলাফত যুগের একটি বিশেষ পর্যায়ে সংঘটিত কয়েকটি গৃহযুদ্ধের কথা উল্লেখ করা যায়। কুচক্রী ও কায়েমি স্বার্থবাদী মহলের ষড়যন্ত্রে বিশ্বনবী (সা.)  হিজরতের প্রায় ৪০ বছর পরই ইসলামের নামে চালু হয় রাজতন্ত্র। ভোগবাদ ও গোত্রবাদসহ জাহিলি যুগের নানা প্রভাব আবারও প্রাধান্য বিস্তার করতে থাকে। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি এত শোচনীয় হয়ে ওঠে যে একজন মদ্যপায়ী, ব্যাভিচারী, জুয়াড়ি ও পুরোপুরি ফাসিক চরিত্রের এক ব্যক্তি ইসলামী খেলাফতের কর্ণধার হয়ে বসে। কিন্তু ইয়াজিদ ও তার দলবলের প্রকাশ্য পাপাচার দেখেও একমাত্র হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) ছাড়া কেউ তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হতে বা প্রকাশ্যে কথা বলতেও সাহসী হয়নি।

আসলে সে যুগে উমাইয়া শাসকগোষ্ঠী ও তাদের সহযোগীরা ইসলামের লেবাস পরেই ইসলামের বারোটা বাজানোর আয়োজন পাকাপোক্ত করছিল। ইসলামের এমন দুর্দিনে যিনি স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও সত্যের ঝাণ্ডা উঁচিয়ে প্রকৃত ইসলামকে আবারও জাগিয়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি ছিলেন মহামতি হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)।

ইসলামী বর্ণনায় এসেছে,  কোনো এক সময় মহানবী (সা.) স্বপ্নে দেখেন যে, বনী উমাইয়্যা তাঁর মিম্বরে বানরের মত নাচানাচি করছে। এ স্বপ্ন দেখে তিনি এমনই শোকাহত হলেন যে, এরপর যতদিন বেঁচে ছিলেন তিনি আর হাসেননি। তাঁর এই স্বপ্ন দেখার পর পবিত্র কুরআনের সুরা বনি ইসরাইলের ৬০ নম্বর আয়াত নাজেল হয়েছিল। ওই আয়াতে বলা হয়েছে:  এবং (স্মরণ কর) যখন আমরা তোমাকে বলেছিলাম যে, নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক মানুষকে পরিবেষ্টন করে আছেন এবং আমরা তোমাকে যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলাম  তা কেবল মানুষের জন্য পরীক্ষার মাধ্যম ছিল এবং কুরআনে বর্ণিত অভিশপ্ত বৃক্ষটিও। আমরা মানুষকে ভীতি প্রদর্শন করতে থাকি, কিন্তু তা তাদের চরম ঔদ্ধত্যকেই কেবল বৃদ্ধি করে। 

তাফসিরে তাবারিসহ কয়েকটি সুন্নি সূত্রমতে, কুরআনে উল্লিখিত ওই অভিশপ্ত বৃক্ষবলতে আবু সুফিয়ানের বংশধর তথা উমাইয়াদের বোঝানো হয়েছে এবং রাসূল (সা.) স্বপ্নে তাঁর মিম্বরে বানরদের নাচানাচির যে ঘটনাটি দেখেছিলেন তার অর্থ উমাইয়াদের মাধ্যমে খেলাফত দখল করা হবে। 

যাই হোক, হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) লক্ষ্য করেন যে, ইসলামের শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে পুরোপুরি বিলুপ্তির ব্যবস্থা করছে উমাইয়া রাষ্ট্রযন্ত্র।  তাই ইসলামকে রক্ষার ও মানুষকে সঠিক পথ দেখানোর গুরু দায়িত্ব পালনের জন্য এগিয়ে আসেন এই মহান ইমাম। তিনি নিজেই এ প্রসঙ্গে বলেছেন: আপনারা জেনে রাখুন যে এরা (বনি উমাইয়ারা) সব সময়ই শয়তানের সঙ্গী। তারা আল্লাহর নির্দেশ ত্যাগ করেছে এবং প্রকাশ্যে  ফাসাদ বা দুর্নীতি ও অনাচার করে যাচ্ছে। তারা আল্লাহর বিধানকে নিষিদ্ধ করেছে এবং জনগণের সম্পদকে ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত করেছে। তারা আল্লাহ যা নিষিদ্ধ বা হারাম করেছেন সেসবকে হালাল বা বৈধ করেছে এবং আল্লাহ যেসবকে হালাল করেছেন সেসবকে হারাম করেছে।

হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) আরো বলেছেন, “হে আল্লাহ! আপনি তো জানেন, আমাদের পক্ষ থেকে যা হচ্ছে তা রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়। দুনিয়ার স্বার্থ হাসিলও আমাদের লক্ষ্য নয়। বরং তোমার দ্বীনকে বাঁচিয়ে রাখা,  তোমার ভূখণ্ডে সংস্কার আনা ও নির্যাতিত ব্যক্তিদের স্বস্তি  দেয়ার জন্যই  আমরা কিয়াম করেছি যাতে ধর্মের ফরজ বিষয় ও বিধানগুলো বাস্তবায়ন করা হয়। 

দুঃখজনক বিষয় হল, মুসলিম বিশ্বের অনেকেই আজও কারবালা বিপ্লবের প্রকৃত ঘটনা, লক্ষ্য, গুরুত্ব এবং ইসলামের প্রকৃত নেতৃবৃন্দ ও অযোগ্য নেতৃবৃন্দের পরিচয় ভালভাবে জানেন না। ইসলামের ইতিহাসের অনেক বাস্তবতাকেই অস্পষ্ট রাখা হয়েছে হাজার হাজার বা লাখ লাখ মিথ্যা হাদীস ও বিকৃত ইতিহাস প্রচারের মাধ্যমে।

ফলে অনেকেই মনে করেন মুসলিম রাষ্ট্রের শাসক যদি জালিমও হয় তবুও তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা নাজায়েজ। তাই ইমাম হোসাইন (আ.) ও তার সঙ্গীরা যে অবর্ণনীয় কষ্টের শিকার হয়েছেন তার জন্য তাঁরাই দায়ী! বিশেষ করে ইমাম হোসাইন (আ.)-কে ইরাকের কুফার দিকে যেতে অনেক সাহাবীই নিষেধ করেছিলেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি কেন তাদের নিষেধ না শুনে সেদিকে গেলেন? কিংবা রাজা-বাদশাহরা পৃথিবীর বুকে আল্লাহর প্রতিনিধি তা তারা যত অযোগ্য বা ফাসেকও হন না কেন! কিংবা কেউ বলেন, আল্লাহ অশেষ ক্ষমাশীল ও দয়ালু তাই ইয়াজিদের মত জালিমকেও ক্ষমা করে দিতে পারেন। অথবা ইয়াজিদের প্রতি অসম্মান করা যাবে না, কারণ তাতে তার পিতাসহ যেসব সাহাবী ইয়াজিদকে সমর্থন জানিয়ে ভুল  করেছেন বা  কথিত ইজতিহাদে ভুলকরেছেন তাদেরও অসম্মান করা হবে! 

অথচ এই শ্রেণীর মানুষ ভুলে যান বুখারি ও মুসলিম শরীফের এই হাদীস যেখানে বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন :  কিয়ামতের দিন আমার সাহাবিদের মধ্যে হতে একটি দলকে (অথবা বলেছেন আমার উম্মতের মধ্য হতে একটি দলকে) আমার সামনে উপস্থিত করা হবে। অতঃপর তাদেরকে হাউজে কাওসার হতে দূরে সরিয়ে দেয়া হবে বা সেখানে প্রবেশ করতে দেয়া হবে না। তখন আমি বলব: হে আমার প্রভু! এরা আমার সাহাবি। মহান আল্লাহ উত্তরে বলবেন: আপনার পরে পরে এরা যা কিছু করেছে সে সম্পর্কে আপনি অবগত নন। তারা তাদের পূর্বাবস্থায় (অজ্ঞতা তথা জাহেলিয়াতের যুগে) প্রত্যাবর্তন করেছিল।

( বুখারী, ৪র্থ খণ্ড, পৃ-৯৪, ১৫৬ পৃ, ২য় খণ্ড, ৩২ পৃ, মুসলিম শরীফ ৭ম খণ্ড, পৃ-৬৬)

কেউ কেউ বলেন, ইয়াজিদ তো ইমাম হুসাইন (আ.)-কে হত্যাই  করেননি, বরং তাঁকে হত্যার জন্য ইবনে জিয়াদকে তিরস্কার করেছেন এবং কেঁদেছেন!

এভাবে নানা পন্থায় কারবালার সত্য ইতিহাসকে বিকৃত করা হচ্ছে এবং এই মহাবিপ্লবের প্রকৃত মাহাত্ম্য, গুরুত্ব ও চেতনাকে খাটো করা হচ্ছে।

বিশ্বনবী (সা.) তাঁর পবিত্র আহলে বাইতকে উম্মতের নাজাতের তরীহিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি উম্মতকে  তাঁর আহলে বাইতের চেয়ে আগ বাড়িয়ে না চলার কিংবা তাঁদের পথ বাদ দিয়ে অন্য কারো পথ  অনুসরণ না করার আহ্বান জানিয়েছেন।

হযরত ইমাম হোসাইন (আ.) আমাদেরকে এটা শিখিয়ে গেছেন যে সত্য ও মিথ্যার লড়াইয়ে নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ নেই। ইয়াজিদের মত দুরাচারী ব্যক্তির শাসনামলের সমালোচনা করে তিনি বলেছেন: তোমরা কি দেখছ না যে, আল্লাহর সঙ্গে করা অঙ্গীকারগুলো ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে,  কিন্তু তোমরা নীরব রয়েছ ও আল্লাহকে ভয় করছ না। অথচ তোমাদের বাপদাদার সঙ্গে করা কিছু অঙ্গীকার ভঙ্গ করা হলে তোমরা কান্নাকাটি কর। অন্যদিকে রাসূল (সা.)র সঙ্গে করা অঙ্গীকারগুলো উপেক্ষিত হচ্ছে দেখেও তোমরা এ বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছ না।

বিশ্বনবী (সা.)র হাদীসে বলা হয়েছে, যারা জালেম শাসক ও  যারা আল্লাহর ঘোষিত হারামকে হালাল করে তাদের ব্যাপারে কেউ যদি নীরব থাকে এবং কোনো প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া না দেখায় তাহলে তারও স্থান হবে ওই জালেম শাসকের জায়গায় তথা জাহান্নামে।

হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর মহাবিপ্লবের লক্ষ সম্পর্কে স্পষ্টভাবেই বলে গেছেন: আমি আমার নানার উম্মতের সংস্কারের জন্য বের হয়েছি। আমি সত কাজের আদেশ দিতে চাই এবং অসত কাজের নিষেধ করতে চাই এবং আমার নানার আচরণ ও সুন্নাত অনুযায়ী আচরণ করতে চাই।

হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) ছিলেন এমন একজন ব্যক্তিত্ব যাঁর সম্পর্কে বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন: "হুসাইন আমার চোখের আলো, সে আমা হতে এবং আমি হুসাইন হতে।  যা কিছু তাঁকে আনন্দিত করে তা আমাকেও আনন্দিত করে, যা কিছু তাঁকে কষ্ট দেয় তা আমাকেও কষ্ট দেয়। আর যা আমাকে কষ্ট দেয় তা আল্লাহকেও কষ্ট দেয়।"

একবার রাসূল (সা.) শিশু হুসাইন (আ.)র জন্য উটের মত হয়ে তাঁকে পিঠে নিয়ে ভ্রমণ করছিলেন। এ দৃশ্য দেখে এক সাহাবী মন্তব্য করেছিলেন, হুসাইনের বাহনটি কতই না উত্তম! জবাবে রাসূল (সা.) বলেছিলেন,  আমার সওয়ারি বা যাত্রীও কতই না উত্তম। বিশ্বনবী প্রায়ই শিশু হুসাইন (আ.)র গলায় চুমো খেতেন। কারবালার অনাগত ঘটনার জন্য কাঁদতেন।


source : http://www.abna.ir/
  1227
  0
  0
امتیاز شما به این مطلب ؟

latest article

      পবিত্র রমজানের প্রস্তুতি ও ...
      সুন্নি আলেমদের দৃষ্টিতে ইমাম মাহদি ...
      ‘১০ বছরের মধ্যে ব্রিটেন হবে মুসলিম ...
      প্রাচীন ইসলামি নিদর্শন ধ্বংস করার ...
      ব্রাসেলসে ইহুদি জাদুঘরে হত্যাকাণ্ড ...
      রজব মাসের ফজিলত ও আমল
      সাড়ে ৫ হাজার ইরাকি বিজ্ঞানীকে হত্যা ...
      ইরান পরমাণু বোমা বানাতে চাইলে কেউই ...
      অশ্রু সংবরণ করতে পারেননি আফজাল গুরুর ...
      ধর্ম নিয়ে তসলিমার আবারো কটাক্ষ

 
user comment